• শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ন
Headline
এআই নজরদারিসহ নতুন অবকাঠামোয় বদলে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন কার্যক্রম সারাদেশে ৩ মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান শুরু কাল, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অবকাঠামোগত জৌলুস বনাম আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির সক্ষমতা সংকট জাপানি ঋণে সুদ ৫ বছরে ৪ গুণ কী লুকাচ্ছে রূপপুর? ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রেই বিকল সোলার সিস্টেম: অবহেলায় নষ্ট শত শত কোটি টাকার সৌর প্রযুক্তি বিহারের আপত্তি বনাম ঢাকার অধিকার: কোন পথে গঙ্গাচুক্তি? টুইন টাওয়ারের ছাই থেকে ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র: নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর রাজপথে নতুন মেরুকরণ: বিভাগীয় লংমার্চে জামায়াত ও এনসিপির শক্তি পরীক্ষার রাজনীতি

টুইন টাওয়ারের ছাই থেকে ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র: নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর

Reporter Name / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইতিহাসের কিছু ঘটনা থাকে যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাকে রক্তাক্ত করে না, বরং গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি, জাতিগত মনস্তত্ত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক দর্শনকে চিরতরে ওলটপালট করে দেয়| বিংশ শতাব্দীর সমাপ্তি এবং একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে তেমনই এক যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব মোড় নিয়ে হাজির হয়েছিল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকালটি| আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানুষের মুখে মুখে ‘নাইন ইলেভেন’ হিসেবে পরিচিত এই দিনটির অভিঘাত আজ আড়াই দশক পেরিয়েও বিশ্বরাজনীতিতে সমানভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে| গত পঁচিশ বছরে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের কাছে এই দুটি শব্দ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়, বরং এক ভয়াল মানবিক ট্র্যাজেডি এবং তার পরবর্তী বৈশ্বিক মেরুকরণের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে| নিউ ইয়র্কের তৎকালীন সুবিশাল আকাশচুম্বী টুইন টাওয়ারে মাত্র সতেরো মিনিটের ব্যবধানে আছড়ে পড়া দুটি যাত্রীবাহী বিমানের আঘাত ওয়াশিংটনের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি যেমন আমূল পাল্টে দিয়েছিল, তেমনি তা বদলে দিয়েছিল বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম নাগরিক ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের প্রতি পরাশক্তি আমেরিকার সার্বিক আচরণ ও মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ|
সেদিন সকালে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বোস্টন থেকে লস অ্যাঞ্জেলসগামী বোয়িং ৭৬৭ বিমানটি যখন নিউ ইয়র্কের ১১০ তলাবিশিষ্ট ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারের ৯০ তলার কাছাকাছি অংশে প্রচণ্ড গতিতে ঢুকে যায়, তখন স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট| প্রথম দর্শনে শহরবাসী তো বটেই, সংবাদমাধ্যমগুলোও একে নিছক একটি ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা দুর্ভাগ্যজনক বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়েছিল| কিন্তু সেই ধারণার বিভ্রান্তি ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি| গোটা বিশ্বের ক্যামেরা যখন প্রথম টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের দিকে তাক করা, ঠিক তখনই সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় আরেকটি বোয়িং বিমান এসে সরাসরি আছড়ে পড়ে দক্ষিণের টাওয়ারটিতে| লাইভ সম্প্রচারে ধরা পড়া সেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি এক নিমেষে স্পষ্ট করে দেয় যে এটি কোনো যান্ত্রিক গলদ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের হৃদপিণ্ডে হানা দেওয়া এক সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত হামলা| কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষার সদর দপ্তর পেন্টাগনে আরেকটি বিমান বিধ্বস্ত হয় এবং চতুর্থ আরেকটি ছিনতাইকৃত বিমান পেনসিলভানিয়ার একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে ভেঙে পড়ে| মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমেরিকার গর্বের প্রতীক ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারই চোখের পলকে ধুলায় মিশে যায় এবং ঘটনাস্থলেই প্রায় তিন হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে|
মার্কিন ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে নাইন ইলেভেনের এই আঘাতকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পার্ল হারবার আক্রমণের চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও স্পর্শকাতর হিসেবে গণ্য করা হয়| ১৯৪১ সালে হাওয়া দ্বীপের পার্ল হারবারে জাপানি বিমানবাহিনীর ঝটিকা আক্রমণে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন, তবে সেটি ছিল একটি যুদ্ধাবস্থায় নৌবাহিনীর সামরিক ঘাঁটির ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ| কিন্তু ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের সেই সকালে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল সম্পূর্ণ বেসামরিক কর্মক্ষেত্রকে, যেখানে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সাধারণ কর্মজীবী মানুষ তাদের নিত্যদিনের দায়িত্বে ব্যস্ত ছিলেন| যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ফ্লোরিডার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সঙ্গে পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর কানে সেই ঐতিহাসিক বার্তাটি ফিসফিস করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল যে ‘আমেরিকা আক্রান্ত’| পরবর্তীতে ২০ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বুশ স্বীকার করেছিলেন যে, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর থেকে পার্ল হারবার ছাড়া তাদের মূল ভূখণ্ডে এমন নারকীয় আঘাতের নজির আর কখনো তৈরি হয়নি| ফলে সার্বভৌমত্বের ওপর এই আঘাত পরাশক্তি দেশটির নিরাপত্তাহীনতার ক্ষতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যার প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় বিশ্বব্যাপী নতুন এক সংঘাতের যুগ|
হামলার পরপরই এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারী হিসেবে ইসলামিক চরমপন্থী নেটওয়ার্ক আল-কায়েদা এবং তাদের পলাতক শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনের নাম সামনে আসতে থাকে| বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ১৯ জনের তথ্য প্রকাশ পায়, যাদের মধ্যে ১৫ জনই ছিলেন সৌদি আরবের নাগরিক, দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এবং একজন করে মিসর ও লেবাননের নাগরিক| এদের পরিচালনায় ও পাইলট প্রশিক্ষণের পেছনে কুয়েতে জন্মগ্রহণকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদের মতো ব্যক্তিদের কারিগরি মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়| মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে বিন লাদেন আগে থেকেই মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ছিলেন| কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ ট্রাক বোমা হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোলে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় আল-কায়েদার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত ছিল| বিন লাদেন বিভিন্ন ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি ও তাদের তৎকালীন পররাষ্ট্রনীতিকে মুসলিম ভূখণ্ডের ওপর আগ্রাসন হিসেবে দাবি করে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন| নাইন ইলেভেনের ৯ দিন পর কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বুশ প্রথমবারের মতো ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন|
সেই ঐতিহাসিক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাকি বিশ্বের উদ্দেশে যে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি নতুন বিভাজনরেখা টেনে দেয়| তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, এই যুদ্ধে যেকোনো দেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবে, নাকি সন্ত্রাসীদের পক্ষ অবলম্বন করবে| সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে এই লড়াই কেবল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন ক্ষান্ত হবে না| ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার দাবি করেছিলেন যে এই যুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি অন্ধ উগ্রবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে| তবে মুসলিম বিশ্বের এক বিশাল অংশের কাছে মার্কিন প্রশাসনের এই দাবি খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি| উল্টো বিশ্বজুড়ে সাধারণ মুসলিমদের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয় যে সন্ত্রাস দমনের আবরণে আমেরিকা আসলে মুসলিম দেশগুলোতে ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি সম্পদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে|
এই আগ্রাসী কৌশলের প্রথম ধাক্কাটি গিয়ে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের ওপর| নাইন ইলেভেনের পরপরই তৎকালীন কাবুলের তালেবান শাসক মোল্লা ওমরের কাছে ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্বকে হস্তান্তরের চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেয় ওয়াশিংটন| তালেবান সরকার পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের দাবি তুলে সেই শর্ত প্রত্যাখ্যান করলে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ নাম দিয়ে আফগানিস্তানে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন শুরু করে মার্কিন ও ন্যাটো জোটের যৌথ বাহিনী| এই অভিযানের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পাহাড়ি গুহাগুলোতে গড়ে ওঠা আল-কায়েদার ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তালেবান শাসনকে উপড়ে ফেলা| তবে সেই যুদ্ধ কেবল সামরিক লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা দীর্ঘ দুই দশকের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয় যা সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার স্থায়ী বীজ বপন করে| আফগানিস্তানের এই অভিযান মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষের ভেতরে প্রবল মার্কিনবিরোধী ক্ষোভ তৈরি করে| পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সিরিয়া কিংবা ইরাকের রাজপথে বড় বড় প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয় এবং অনেক জায়গায় বিন লাদেনকে পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়|
আফগানিস্তানের পর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের পরিধি আরও আগ্রাসী রূপ নেয় ২০০৩ সালে, যখন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কাল্পনিক ও অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা| পরবর্তীতে ২০১১ সালে আরব বসন্তের অস্থিরতার মধ্যে উত্তর আফ্রিকার লিবিয়াতেও সামরিক হস্তক্ষেপ করে ন্যাটোর বিমানবাহিনী| একের পর এক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সামরিক অভিযান, নির্বিচার বোমাবর্ষণ এবং রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দেওয়ার এই ধারা আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে| ইউরোপের লন্ডন, রোম কিংবা ব্রাসেলসের রাজপথে যেমন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষের শান্তিবাদী মিছিল হয়েছে, তেমনি ইস্তাম্বুল, কায়রো কিংবা করাচির মতো শহরগুলোতে আমেরিকার প্রতি অন্ধ ক্ষোভ ও ঘৃণা চরম রূপ ধারণ করে| অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে ওয়াশিংটনের একপেশে অবস্থানের কারণে মুসলিম জনমানসে আগে থেকেই যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, নাইন ইলেভেন-পরবর্তী ইরাক ও আফগান যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ সেই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়|
যুদ্ধের এই বৈশ্বিক উত্তাপ সবচেয়ে করুণভাবে আছড়ে পড়েছিল খোদ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে এবং পশ্চিমা সমাজগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ ও নিরীহ মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর| নাইন ইলেভেনের ভবনের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজ শেষ হতে না হতেই আমেরিকার ঘরোয়া সমাজে ইসলামবিদ্বেষ বা ‘ইসলামোফোবিয়া’ বিষাক্ত রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে| যে দেশের সমাজ নিজেদের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে গর্ব করত, সেই দেশেই সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন এক আতঙ্কের বৃত্তে বন্দি হয়ে যায়| টুপি, দাড়ি কিংবা নারীদের হিজাব পরা মানুষগুলোকে মেট্রো স্টেশন, বিমানবন্দর ও শপিং মলে বৈরী সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়| রাস্তাঘাটে শারীরিক হেনস্তা, মসজিদে অগ্নিসংযোগ এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা নিত্যদিনের সংবাদে পরিণত হয়|
আমেরিকান কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই এই ঘৃণাজনিত অপরাধের ভয়াবহ উল্লম্ফন স্পষ্ট হয়ে ওঠে| সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষী হেট ক্রাইম বা ঘৃণাসূচক হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল মাত্র ২৮টি, আর তার আগের বছর ১৯৯৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩২টি| কিন্তু নাইন ইলেভেনের সেই কালান্তক ঘটনার পর ২০০১ সালে এই ঘৃণামূলক হামলার সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে| তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই ৪৮১টি হামলার প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি সংঘটিত হয়েছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে| সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সেই সাময়িক উত্তেজনার ঢেউ পরবর্তীতে আর কখনো পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি| ২০০১ সালের পর থেকে ২০২৫ সালের দীর্ঘ আড়াই দশকে কোনো একক বছরেই এই বিদ্বেষমূলক অপরাধের সংখ্যা একশর নিচে নামেনি| অর্থাৎ ইসলামবিদ্বেষ কোনো সাময়িক আবেগ ছিল না, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কাঠামোর একটি স্থায়ী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছিল|
আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও মুসলিমদের ওপর নজরদারির এমন এক কঠোর জাল বিছানো হয়েছিল যা নাগরিক স্বাধীনতার ধারণাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়| যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রণয়ন করে ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট’, যার মাধ্যমে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে যেকোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন কল এবং আর্থিক লেনদেনে নজরদারি করার সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়| এর প্রধান শিকার হন দেশটির সাধারণ মুসলিম পরিবারগুলো| দাতব্য সংস্থাগুলোতে অর্থ প্রদান বন্ধ হয়ে যায়, কারণ সামান্য অনুদানের অর্থও কোনো দূরবর্তী সহিংসতায় ব্যবহার হচ্ছে কি না সেই সন্দেহে বহু ইসলামি এনজিও বন্ধ করে দেওয়া হয়| মুসলিম তরুণদের পরিচয়পত্রে ‘র‍্যান্ডম চেকিং’-এর নামে নিয়মিত বিমানবন্দরগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করার যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তা পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম-আমেরিকানদের মধ্যে এক গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ ও মানসিক ট্রমার জন্ম দেয়|
আজ আড়াই দশক বা পঁচিশ বছর পূর্তির এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকানো যায়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যে নাইন ইলেভেন কোনো একক দিনের ট্র্যাজেডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি| এই দিনটি বিশ্বব্যবস্থার মূল চরিত্রকেই বদলে দিয়েছে| এর ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক ধরনের স্থায়ী অবিশ্বাস, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর নজরদারির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| পরাশক্তি আমেরিকা সামরিক শক্তিতে বিশ্বজুড়ে দাপট দেখালেও নাইন ইলেভেনের ধাক্কায় নৈতিক ও কৌশলগতভাবে এমন এক ঘূর্ণাবর্তে প্রবেশ করেছিল, যা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তৈরি করেছে স্থায়ী ক্ষত| নিউ ইয়র্কের সেই গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যে প্রতিশোধের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা বিশ্বশান্তির বৃক্ষকে বহুলাংশে শুকিয়ে ফেলেছে| পরিশেষে বলা যায়, সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ নির্মূলের নামে যে বৈশ্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসমুক্ত কোনো বিশ্ব উপহার দিতে পারেনি; বরং তা পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দেয়াল তুলে দিয়েছে, যার মাশুল আজও গুনে চলেছে সাধারণ নিরপরাধ মানবতা|

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category