পেছনে পাহাড়, সেখানে প্রাচীন জঙ্গল। বাড়িটি মাঝারি হলেও এলাকা বিশাল। প্রায় বিশ একর। মালিক খুব শখ করে বানিয়েছিলেন। এখন ভাড়া দিয়েছেন। চমৎকার বাগান, আবার বুনো অরণ্যও চারপাশ ঘিরে আছে। সবচে সুন্দর হলো সমুদ্রের তীরেই কাচের ডাইনিং হল। খেতে খেতে উপচে আসা ঢেউ দেখা যায়। লাল সূর্য যখন ডুব মারে মনে হয় সে নিজের বুকে টুপ করে ঘুমানোর জন্য ঢুকে গেলো।
বাড়িতে শুধু আমি আর পলিন। এছাড়া কেয়ারটেকার আর বাবুর্চি। অবশ্য নিরাপত্তার জন্য চারজন আর্মড পুলিশ আছে। তারা দুজন থাকে গেইটে, দুজন টহল দেয়। বোঝাই যায় সরকার ব্যাপারটি সিরিয়াসলি নিয়েছেন।
পলিন এমারসন বলে কথা।
বাড়িতে ঢুকেই পলিন প্রায় চিৎকার করে উঠলো, “ওহ! এত সুন্দর! সো বিউটিফুল। ধন্যবাদ সৈয়দ।”
আমি হেসে বললাম, আমাকে নয়, আমার অরগানাইজেশনকে ধন্যবাদ দাও। তাঁরাই এটার জন্য পে করবেন। আমি শুধু খুঁজে বের করেছি। তুমি শর্ত দিয়েছিলে প্রাইভেসি চাও।”
“ওয়ান্ডারফুল! আমি কি এক্ষুনি সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে পারি?”
” খিদে না থাকলে পারো। তবে—-”
পলিন হেসে বললো, “ভয় পেয়ো না, আমি তোমার দেশের কালচার জানি। আমার সুইমিং স্যুট যথেষ্ট ভদ্র।”
“ধন্যবাদ পলিন।”
“তুমি বিশ্রাম নাও সৈয়দ, আমি এক ঘণ্টা সাঁতার কাটবো। তারপর হালকা খাবার দিতে বলো, প্লিজ।
অ্যান্ড মে আই হাগ ইউ অ্যাগেইন? আই মাস্ট থ্যাংক ইউ।”
আবার জংলি বুনো গন্ধ আমার গাল ছুঁয়ে গেল।
ঘণ্টাখানেক পর খেতে বসেছি। আমি ভেতো বাঙালি, তাই ভাতই ভরসা, পলিন কার্ব দুচোখে দেখতে পারে না, তাই সে নিয়েছে সালাদ আর কফি।
খেতে খেতে বললাম, “যদিও তোমার প্ল্যান মেইল করেছো, তারপরও আরেকবার বললে ভালো হয়।কারণ কয়েকটা পারমিশন নেওয়া লাগবে, আবার তোমার জন্য নির্দিষ্ট ‘বারকোড’ নিতে হবে। ওটা ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকা যাবে না। আমি মোটামুটি সব গুছিয়ে রেখেছি। তারপরও স্থানীয় প্রশাসনকে পুরো ব্যাপারটা আমার আবার জানানোর কথা।সিকিউরিটির ব্যাপারটাও দেখতে হবে।”
পলিন প্লেটে চামচ রেখে বলল, আগের প্ল্যানই ঠিক আছে। আমি স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলব। সব মেগা ক্যাম্পে যাব। স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও কথা বলব। এখানে বাইরের যেসব সংস্থা কাজ করছে তাদের সাথেও বসব। তবে আমার মেইন ফোকাস হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা। এসব ক্যাম্পে যেসব শিশু আছে তাদের শিক্ষা না দিলে বিশাল একটি অন্ধ জেনারেশন তৈরি হবে, যার চাপ শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীই নিতে অক্ষম। আমার আগে প্ল্যান অনুযায়ী সব মিটিং কিন্তু তোমার ঠিক করে রাখার কথা।”
“তা করা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে আগামী সাতদিন তুমি নিজেও ঘুমাবে না, আমাকেও ঘুমাতে দেবে না। তবে আমি আজই তোমার ‘বারকোড’ এর ব্যবস্থা করে ফেলছি। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে মেইল করে দিচ্ছি। আশা করি রাত নটার মধ্যেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ওরা সন্ধ্যার পরও জরুরি কাজ করে।”
পলিন সালাদ মুখে দিতে দিতে বললো, হ্যাঁ, ঘুমানোর সময় পাবো না এটা ঠিক। তবে সকাল বিকাল দুঘণ্টা সাঁতার না কেটে আমি কোথাও যাচ্ছি না। এমন ভার্জিন বিচ আমি আর দেখিনি। চাইলে তুমি আমার সাথে যোগ দিতে পারো। হোপ ইউ আর নট দ্যাট মাচ কনজারভেটিভ। বন্ধুর সাথে সাঁতার কাটাই যায়। নাকি সমস্যা আছে?”
“না কাটাই ভালো। স্থানীয়রা ভালোভাবে নেবে না। ”
“আই সি। তাহলে আমি একাই সমুদ্র স্নান করবো। কী আর করা?”
পলিন খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছছে। তার বাম হাতের অনামিকায় শেষ বিকেলের আলোয় অসম্ভব সুন্দর একটি আঙটি ঝকমক করে উঠলো। বোঝাই যায় এনগেজমেন্ট রিং। কারণ এ আঙুলেই একমাত্র এনগেজমেন্ট রিং পরা হয়। একটু অবাক হলাম। মাত্র কমাস আগেই পত্রিকায় দেখেছিলাম পলিনের বিয়ে ভেঙে গেছে। গুজব ছিল নামকরা এক ফটো জার্নালিস্টের সাথে তার অ্যাফেয়ার চলছিল, তার সূত্র ধরেই বিবাহ বিচ্ছেদ। মনে হয় নতুন বন্ধুর সাথে এনগেজমেন্ট হয়েছে। ভদ্রতা করে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। তবে অবাক হয়ে আঙটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এত বড়ো হীরে আমি আর আগে দেখিনি। সমুদ্রের উপর আকাশে ভাসতে থাকা মরা সূর্যের আলোও তাতে প্রতিফলিত হয়ে সহস্র আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে।