• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন
Headline
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারের নানা কর্মসূচি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকোটকে সমর্থন আরব জোটের, কোণঠাসা নেতানিয়াহু ৩০ বিলিয়নের নিচে রিজার্ভ, তবু মেটানো যাবে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় গডফাদার ১ হাজারের বেশি: কোটি মাদক জব্দের পরও বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে ৮৫ শতাংশ ৩ বছর পরপর হালনাগাদ হবে সরকারি নির্মাণের দর, ৬ মাসে ডিজিটাল ব্যবস্থা ৩ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্সেও কাটছে না চাপ ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার আবেদন: এনআইডি সংশোধনের নামে সক্রিয় ভয়ংকর চক্র বিপ্লব ও সংহতি দিবস : জিয়া জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারী রাজধানীর ৫৭ ওয়ার্ডের ১৪ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা: ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ২৯টি ঘুড়ির নাটাই আপনার হাতে

পোশাক খাতে অস্থিরতা ও নাশকতায় অর্থায়ন: সাবেক মন্ত্রী ও শীর্ষ শিল্পপতিসহ কুড়ি ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ

Reporter Name / ১২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক শিল্পখাতে বিগত কিছুদিন ধরে চলা তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ এবং অস্থিতিশীল পরিবেশের নেপথ্যে অর্থায়ন ও জনবল দিয়ে সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের ভিত্তিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী শিল্পপতি, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অন্তত কুড়িটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের পক্ষ থেকে দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনা পাঠিয়ে অবিলম্বে হিসাবগুলো স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও দলীয় সুবিধাভোগী একটি বিশেষ চক্র তৈরি পোশাক খাতের চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিয়ে আসছে। গত মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক অনুষ্ঠানে সংস্থার চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা সেল বা সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা বিভাগের পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই কুড়িটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বন্ধের এই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জব্দ হতে চলা ব্যাংক হিসাবের এই দীর্ঘ তালিকায় দেশের স্বনামধন্য অন্তত বারোটি বড় শিল্প গ্রুপের শীর্ষ কর্তাব্যক্তি ও মালিকদের নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে টিপু মুনশির নাম, যিনি বিগত সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একই অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রভাবশালী মালিক সালমান এফ রহমানের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হচ্ছে, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়া এনাম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসা গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্রুপের মালিক ও সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ব্যাংক হিসাবও এই নির্দেশের আওতায় রয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছে সুপরিচিত ফেভিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী এবং অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু। এর পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মোশাররফ হোসেন এবং গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপার মতো শীর্ষ শিল্পপতিদের আর্থিক হিসাবও স্থগিত করা হচ্ছে। শিল্পমালিকদের একটি অংশের এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দেশের শিল্প মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রাজধানীর মিরপুর ও এর আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক আন্দোলনের নামে চলা বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বা বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আরও বেশ কিছু ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব এই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগনে আলিফ মোল্লা, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের বিশ্বস্ত সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী এবং শুভ নামের এক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে অনলাইনে এই পুরো নাশকতামূলক কার্যক্রম ও আন্দোলন পরিচালনার সমন্বয় করার দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তাঁর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশটি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে আন্দোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন উসকানিমূলক ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অপপ্রচার ও উসকানি ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিল প্রায় দেড় শ ব্যক্তি, যাদের একটি বড় অংশের ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দের আওতায় আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে পোশাক খাতের চলমান এই অস্বাভাবিক অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে এবং এই নাশকতায় কিছু অসৎ শিল্পমালিকও জড়িত রয়েছেন বলে সরকারের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট রিপোর্টের ভিত্তিতেই দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংককে ইমেইলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে অবরুদ্ধ বা জব্দ করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। এর আগে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন আইনি সংস্থার মাধ্যমে এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধে পৃথক দুর্নীতির মামলা ও তদন্ত পরিচালিত হয়ে আসছে। এদের কেউ কেউ বর্তমানে কারাবন্দী রয়েছেন এবং অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন যে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো একটি সংবেদনশীল খাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা এবং শ্রমিকদের ব্যবহার করে ফায়দা লোটার এই অপচেষ্টা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক এক হুমকি। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বিনষ্ট করতে এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে নস্যাৎ করতে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে গোপনে এই ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছিল।

ব্যাংক হিসাব জব্দের এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপে অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অবৈধ কার্যক্রম অনেকটাই থমকে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দেশের শিল্প নিরাপত্তা এবং শ্রম বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে এই ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য কুচক্রী মহলকেও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

সব মিলিয়ে পোশাক খাতের চলমান সংকট নিরসন এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের এই কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category