১) ক্লাস এইটে স্কুল পালিয়ে ধরা খেলাম। প্রতিদিন বাসা থেকে বেরিয়ে চট্টগ্রামের বাটালি হিল চলে যেতাম। স্কুল টাইম শেষ হলে ফিরতাম। ব্যাপারটা ধরা পড়ল বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ করার পর। স্কুল থেকে আব্বাকে জানানো হলো, আমি প্রায়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাকি। আমার তো ভয়ে অস্থির অবস্থা!
আব্বা এমনিতে খুব নরম মানুষ, কিন্তু প্রয়োজনে অতি কঠিন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – ‘তুমি স্কুলে না গিয়ে কোথায় যেতে?’
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম- ‘বাটালি হিল।‘
‘কেন? স্কুল ভালো লাগে না?’
আমি মাথা নেড়ে না সূচক উত্তর দিলাম।
আব্বা আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন- ‘স্কুল অতীতেও কারো ভালো লাগেনি, ভবিষ্যতেও ভালো লাগবে না। তবে তোমার স্কুল ফাঁকি দেওয়ার দরকার নেই। যেদিন যেতে ইচ্ছে করবে না যেও না। যেটা আমাকে বলে করা যাবে, সেটা লুকিয়ে করার দরকার কী?’
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এরপর আমি একদিনও স্কুলে অনুপস্থিত থাকিনি। কারণ আব্বা স্কুলে না যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে স্কুল পালানোর মধ্যে যে অ্যাডভেঞ্চার আছে তা নষ্ট করে দিয়েছিলেন। মনে হতো, যেটা তাঁকে বলে করতে পারব, তা চুরি করে করার দরকার কী?
একটা শব্দ বকা না দিয়ে শাসন করার কী অসাধারণ ধরন, তাই না?
২) এশিয়া উইক নামের বিদেশি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনটি আব্বার খুব প্রিয় ছিল। দাম বেশি ছিল বলে মাসে একটি কিনতেন। পড়া শেষে একটি বেতের সেলফে সাজিয়ে রাখতেন। আমরা তখন ক্রিকেট খেলতাম তক্তা কেটে ব্যাট বানিয়ে, উইকেট সাজাতাম ইট দিয়ে। একবার ঠিক হলো, দলের সবাই চাঁদা দিয়ে ব্যাট এবং উইকেট কেনা হবে। আমি চাঁদা জোগাড় করার জন্য কাউকে না জানিয়ে আব্বার জমানো এশিয়া উইকগুলো বিক্রি করে দিলাম! ভেবেছিলাম, পুরানো পত্রিকা তো কটকটি কেনার জন্য কতই তো বিক্রি করি। এগুলো করলে সমস্যা কী?
আব্বা বিকেলে বাসায় ফেরার পর তাঁর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, তাঁর প্রিয় ম্যাগাজিনগুলো নেই! জেরার মুখে বের হয়ে এলো, এগুলো কোথায় গেছে এবং কালপ্রিট কে?
আমি ভয়ে কাঁপছি। কিন্তু আব্বা শান্ত গলায় বললেন- ‘বাবা, এই পত্রিকাগুলো হংকং থেকে বের হয়। জোগাড় করা বেশ কষ্ট। যে কপিগুলো তুমি বিক্রি করেছ, সেগুলোতে অনেক মূল্যবান আর্টিকেল ছিল। দেশী পত্রিকা হলে না হয় ওদের অফিসে গিয়ে ওগুলো আবার কালেক্ট করতে পারতাম। কিন্তু হংকং থেকে তো এশিয়া উইকের এতগুলো পুরোনো কপি আমার পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। বাদ দাও, যা হওয়ার হয়ে গেছে, তবে একটা কথা মনে রাখবে- যা তোমার নয় তা বিক্রি করার অধিকার তোমার নেই। আর কখনো এ কাজ করবে না।’
কোনো রাগ নয়, বেত নয়, কিন্তু চিরদিন বুকে গেঁথে থাকার মতো শাসন!
৩) আমাদের বর্ধিত পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনেক। ওরা সবাই আলাদা আলাদা থাকলেও আমার স্ত্রী ছেলেবুড়ো সবার সমস্যা সামলায়। সবার যত্ম নেয়। এগুলো বেশ ভালো ঝামেলার কাজ। কিন্তু সে খুব খুশি মনে এ দায়িত্ব পালন করে -বরং আমার মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্ত লাগে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘তুমি সবসময় সবার সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাও কেন? এত হাঙ্গামা মাথায় নেওয়ার দরকার কী?’
সে উত্তর দিলো- ‘ বিয়ের পর এই সংসারে বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন একবারও আমাকে নাম ধরে ডাকেননি। সবসময় মা ডেকেছেন। তিনিই তো আমাকে সবার মা বানিয়ে দিয়েছেন। আমি তাদের ব্যাপারে চুপ থাকি কী করে?’
একটি সম্বোধন যে মানুষের মনোজগতে এত বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে তা আমার জানা ছিল না!
– আসুন মায়া ছড়াই