• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

আঠার বছর বয়স- জীবন যুদ্ধের প্রস্তুতি: নুর স্যারের আট উপদেশ

বাদল সৈয়দ / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

১৯৮৫ সাল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। লোক প্রশাসন বিভাগে।
এসএসসি/এইচএসসির রেজাল্টের গরম- বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন জীবনের উত্তাপ- সাম্প্রতিক কবিত্ব লাভের আগুন- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, দুনিয়া পায়ের নিচে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
পড়ালেখা শিকেয় উঠেছে। ক্লাসে যাই না- টং দোকানে চায়ের কাপ হাতে আঁতেলগিরি করে দিন কাটে। যারা ক্লাসে যায় তাদের ‘ডুডু’ খায় বলে করুণা হয়।
আবদুন নুর স্যার সম্ভবত তখন লোক প্রশাসন বিভাগের প্রধান। খুব রাশভারী মানুষ- একইসাথে খুব স্মার্ট। ভয়ে সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলে। আমি থাকি একশ হাত দূরে।
তারপর আকাশে দিলো দুর্যোগের ঘনঘটা। একেবারে মালির ঘাড়ে গিয়ে পড়লাম। একদিন কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সিগারেট টানতে টানতে সিঁড়ি ভাঙছি, ঠিক এমন সময় উঠে আসছেন নুর স্যার।
আমাকে দেখে গোল সোনালি চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন। তারপর বললেন-‘ আমার সাথে এসো।‘
আমি ভয়ে সিগারেটসহ হাত পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছি। আরেকটু হলেই আগুন প্যান্টের সর্বনাশ করবে।
নুর স্যার হনহন করে আমাকে পার হয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগলেন। আমি সেই সুযোগে দ্রুত সিগারেট পায়ের নিচে মাড়িয়ে ফেললাম।
স্যারের রুমে ঢোকার পর তিনি আমার দিকে আবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর চাহনিতে হতাশা।
তারপর বললেন-
‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছ। তাই ধরে নিচ্ছি তোমার বয়স আঠার হয়েছে বা খুব শিগগির হবে। একেবারে ফেটে পড়া যৌবন। এই সময়টা নিয়ে চমৎকার একটি কবিতা আছে। ক্যাম্পাসের দেয়ালে প্রায় লেখা থাকে। বলতে পারো কোন কবিতা?’
আমি মৃদু গলায় বললাম-
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।‘
নুর স্যার প্রথমবারের মতো মৃদু হাসলেন। বললেন- ‘চমৎকার একটি কবিতা। আসলেই যৌবন হচ্ছে যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। তবে কবি যে যুদ্ধের কথা বলেছেন, তার সাথে আমি যে যুদ্ধের কথা বলি তা আলাদা।‘
আমি কৌতূহল নিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছি।
তিনি কোন যুদ্ধের কথা বলছেন?
স্যার আবার হাসলেন – ‘আমি মনে করি আঠার হচ্ছে জীবনযুদ্ধের জন্য তৈরি হওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় পরিবারের সাপোর্ট থাকে। আর এখান থেকে বের হওয়ার পর পরিবার সাপোর্ট আশা করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে শুরু হবে তোমার জীবন যুদ্ধ। এটা খুব কঠিন যুদ্ধ এবং যুদ্ধটা তোমার একার। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে- এতদিন যা ছিলে তা আর থেকো না। বদলে যাও। আঠার হচ্ছে বদলে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়।‘
বলতে বলতে তিনি সোনালি চশমা চোখ থেকে নামিয়ে রুমাল দিয়ে মুছলেন। তাঁর উজ্জ্বল চোখগুলোর দীপ্তি আমাকে চমকে দিলো। টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খেয়ে তিনি আবার বলা শুরু করলেন-
‘প্রতি বছর নতুন নতুন ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আমার মনে হয় এক ঝাঁক নতুন গোলাপ বাগানে ফুটেছে। তারপর চিন্তা করি- গোলাপগুলো জীবন যুদ্ধে কুঁকড়ে যাবে না তো? তাই আমি তাদের কিছু পরামর্শ দেই- তোমাকেও দেবো। মন চাইলে মানতে পারো- না চাইলে মেনো না। আফটার অল, ইট ইজ ইয়োর লাইফ, নট মাইন। জীবনটা তোমার, আমার না।‘
তারপর তিনি কিছু উপদেশ দিলেন। যেগুলো মনে আছে, সেগুলো নিচে লিখলাম-
১) গেট ইয়োর লাইফ ইন অর্ডার
এতদিন যেমন ইচ্ছে চলেছ, এখন জীবনকে শৃঙ্খলাবন্দি করো। যদি তা না করো, তবে বাকি জীবন শৃঙ্খলা আনতে পারবে না। ডিসিপ্লিন ইজ নট বিল্ট ইন অ্যা ডে। ইট ইজ অ্যা ম্যাটার অব প্র্যাকটিস। তাই এখন থেকে এ প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে। বিশৃঙ্খল জীবন খুব বিধ্বংসী জীবন।
২) ইনভেস্ট ইন স্টাডি- রিপ প্রফিট ল্যাটার
এখন পড়াশোনাটাই মুখ্য। এই ক্যাম্পাস ছেড়ে বের হওয়ার পর যে লড়াই শুরু হবে তাতে তোমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে রেজাল্ট। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অনেক রঙিন- সমস্যা হচ্ছে এই রঙ উপভোগে বেশি মত্ত থাকলে পরবর্তী জীবন হয় সাদা-কালো। তাই উপভোগের লাল-নীল রঙে ভেসে যেও না। এরপরের জীবনেও যাতে রঙিন বেলুনে উড়তে পারো তার জন্য পড়াশোনায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দাও।
৩) নলেজ নেভার বিট্রেইজ
শুধু নিজের বিষয় নয়- এখন সময় হচ্ছে গোগ্রাসে সবকিছু শেখার। শুধু নিজের বিষয়ে জানলে জীবন থমকে যাবে। তাই চারিদিকে যা শেখার মতো দেখো তাই শেখো। তুমি লোক প্রশাসনের ছাত্র। তাই বলে শুধু এই বিদ্যায় নিজেকে পণ্ডিত বানালে চলবে না। সব ব্যাপারে জানার চেষ্টা করো। কে জানে হয়ত একদিন রানী মৌমাছির জীবনচক্র সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন তোমার জীবন বদলে দেবে- যার সাথে লোক প্রশাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্ধকারে তোমার ছায়াও বেঈমানি করে, কিন্তু নলেজ নয়। ইট নেভার বিট্রেইজ।
৪) চিপ প্লেজার: চিপ লাইফ
তোমাদের বয়সটা আনন্দ খোঁজে। উল্লাস খোঁজে। প্লিজ ডু নট রাশ ফর চিপ ডোপামিন। সস্তা বিনোদন খুঁজো না- ক্ষতিকর আনন্দ খুঁজো না। বি কেয়ারফুল। ক্ষতিকর, সস্তা আনন্দের অপর পাড়ে অপেক্ষা করছে তীব্র বিষাদ। চিপ প্লেজার মিনস চিপ লাইফ। সস্তা আনন্দ সস্তা জীবন উপহার দেয়।
৫ ) হেলথ ম্যাটারস
স্বাস্থ্য আসলেই সব সুখের মূল। সবকিছু অর্জন করলে কিন্তু শরীর ঠিক রাখলে না- তাহলে জীবন বরবাদ যাবে। কোনোকিছুতেই আনন্দ পাবে না। এমন কিছু করো না যাতে শরীরের বারোটা বাজে। একটি মিথ্যা প্রবাদ আছে, তাহলো-
‘শরীরের নাম মহাশয়-
যাহা সহাবেন তা-হাই সয়।’
কথাটা শতভাগ মিথ্যা। শরীর সবকিছু সয় না। এর উপর অত্যাচার করলে একদম ভেঙেচুরে জীবন ছাড়খার করে দেয়।
৬ ) গুড মেন্টর
অনুসরণ করার মতো একজন ভালো মেন্টর খুঁজে নাও। জীবনে একজন ভালো পথ প্রদর্শক থাকা খুব জরুরি। তার একটি কথা তোমাকে একশটি ভুল থেকে বাঁচাতে পারে। মনে রাখবে, ভালো মানুষের ছায়া অনুসরণ করলে স্বর্গেরও সন্ধান পাওয়া যায়।
৭ ) ফ্রেন্ডস কিল-ফ্রেন্ডস লিফট
বন্ধুরা তোমাকে ডোবাতেও পারে, ভাসাতেও পারে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সাবধান হও। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে যে বন্ধুরা তোমার সাথে আড্ডা মারে তারা যেমন তোমার ভালো বন্ধু নয়- একইভাবে তুমিও তাদের ভালো বন্ধু নও। ইউ কিল ইচ আদার।
৮ ) ইয়োর লাইফ ইয়োর রেসপনসিবিলিটি
মনে রাখবে, ম্যাক্সিমাম ২৪ পর্যন্ত তোমাকে অন্যরা দেখবে। তারপর তুমি অন্যের বোঝা হয়ে যাবে। তখন তোমার জীবন- তোমার দায়িত্ব। আর কেউ এ দায়িত্ব পালন করবে না। তাই আঠার থেকে সে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নাও।
স্যার আবার চশমা খুলে তা রুমাল দিয়ে মুছছেন। তাঁর চোখের দীপ্তিতে আমি ঝলসে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি, এইমাত্র তিনি খুব জোরে ধাক্কা দিয়ে আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন।
সবার জীবনে এরকম ধাক্কা খুব দরকার।
-আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category