ছোটবেলায় ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত স্কুল শেষ হতো বেলা বারোটায়। বাসায় আসার পর আম্মা গোসল করাতেন, তারপর খাইয়ে ঘুম পাড়াতেন।
এখনো চোখে ভাসে, আমি বিছানায় আম্মার বুকে শুয়ে আছি। আম্মা আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আর মিষ্টি গলায় গাইছেন…
‘ আয়রে পাখি লেজ ঝোলা
খোকাকে নিয়ে কর খেলা
খাবিদাবি কলকলাবি
খোকাকে নিয়ে ঘুম পাড়াবি।’
মায়ের রিনঝিন গান মাথায় নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।
এখন আমার অনেক বয়স।
তাই বইপত্র পড়ে জানি স্কুল থেকে ফেরার পর এই ঘুম কত গুরুত্বপূর্ণ। আমার মা এত পড়ালেখা না করেও ব্যাপারটা জানতেন!
স্কুল থেকে ফেরার পরের দুই ঘণ্টা বাচ্চাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ সময় কিছু কাজ করতে নেই।
সেগুলো কী?
১ ) চার-পাঁচ ঘণ্টা স্কুলে পড়াশোনার চাপ নিয়ে শিশুর মস্তিষ্ক ওভারলোডেড থাকে। এ সময় তাদের ব্রেনে চাপ পড়ার মতো কিছু করা উচিত নয়। তা করা মানে পানিভর্তি গ্লাসে অতিরিক্ত পানি ঢালা। এতে গ্লাস থেকে পানি উপড়ে পড়ে যেমন টেবিলক্লথ বরবাদ হয়, ঠিক তেমনি এসময় অতিরিক্ত চাপ দিলে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। স্কুলের পর অন্তত দুই ঘণ্টা ওর ওপর কোনো কিছু নিয়ে চাপ দেবেন না।
২ ) স্কুল থেকে ফিরে আসার পরপর জোর করে খাওয়াবেন না। স্কুলে অনেক শিশু ক্লান্ত থাকে। তাই বাসায় এসে সাথে সাথে খেতে চায় না। তাই ওকে একটু সময় দিন। দেখবেন কিছুক্ষণ পর খিদে লাগলে ও এমনিতেই খাবে।
৩) শিশুকাল ঘোড়দৌড় নয় যে সারাক্ষণ দৌড়াতে হবে, নয়ত রেসে হেরে যাবে। কিছু সময় আছে যখন তার বিশ্রাম দরকার। স্কুল থেকে ফেরার পর দুই ঘণ্টা তার বিশ্রামের সময়। তা না করে তাকে তখন পড়াশোনার ঘোড়ায় চাপিয়ে দিলে সে এক সময় তা থেকে ছিটকে পড়বে। মনে রাখবেন, এই ঘোড়দৌড়ে কেউ ছিটকে পড়লে কেউ উদ্ধার করতে আসে না। বরং অন্যরা তাকে মাড়িয়ে যায়। যাতে সে ঘোড়া থেকে ছিটকে না পড়ে সে জন্য এ দুই ঘণ্টা তাকে পড়াবেন না, কোচিংয়ে নেবেন না।
৪) শুধু পড়াশোনা নয় এ সময় তাকে গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস, আর্টের ক্লাস কিছুতে নেবেন না। এগুলোও চাপ সৃষ্টি করে।
৫ ) স্কুল থেকে ফেরার পরপরই আজ হোমওয়ার্ক কী দিয়েছে? মিস কোনো নোট দিয়েছে কিনা? তা নিয়ে ওর মাথা খারাপ করে দেবেন না। প্রায় সব শিশুর কাছে স্কুল মানে যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধ থেকে ফেরার পর অন্তত দুই ঘণ্টা প্রশ্নবানের নতুন যুদ্ধে নামাবেন না।
৬) ঘুমেই যে তার বিশ্রাম হবে এমন নয়- বরং অনেক শিশু এ সময় ঘুমাতে চায় না। সেক্ষেত্রে সে যা করে আনন্দ পায় তা করতে দিন। সে খেলতে চাইলে খেলতে দিন, গল্প শুনতে চাইলে তা শোনান, ছড়ার বই নিয়ে বসতে চাইলে তা করতে দিন, টিভিতে কার্টুন দেখতে দিন। যা ইচ্ছা তা করুক। শুধু মোবাইল দেবেন না।
৭ ) এ সময় উপদেশে শিশুরা কান দেয় না। উল্টো ভারাক্রান্ত হয়। তাই স্কুল থেকে ফেরার পর উপদেশের ঝাঁপি খুলে বসবেন না।
৮ ) মনে রাখবেন-
‘Rest’ means a complete sentence.
‘বিশ্রাম’ শব্দটি একটি পরিপূর্ণ বাক্য।
তাই স্কুলের পরের দুই ঘণ্টা শুধু বিশ্রাম। আর কিছু নয়।
লেখাটি শেষ করার আগে আম্মার কাছে গেলাম। বললাম- ‘আম্মা, তুমি আমাকে যে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতে সেটা মনে আছে?’
আমার মা বললেন- ‘সেগুলো কী ভোলা যায়, আব্বা?’
আমি তার পাশে শুলাম। তারপর বললাম- ‘আরেকবার গাইবে, আম্মা?’
আম্মা খুব লজ্জা পেলেন। বললেন- ‘বয়স হয়েছে, এখন কী আর গলা ঠিক আছে, আব্বা?’
‘তবু গাও না’- বলে তাঁর পাশে চোখ বুজলাম। তিনি আমার বুকে মাথা গুঁজে রাখলেন।
সময় পাল্টেছে। আগে আমি আম্মার বুকে ঘুমাতাম। এখন তিনি আমার বুকে ঘুমান!
একটু পর শুনলাম আম্মা গাইছেন-
‘ আয়রে পাখি লেজ ঝোলা
খোকাকে নিয়ে কর খেলা
খাবিদাবি কলকলাবি
খোকাকে নিয়ে ঘুম পাড়াবি।‘
বয়সের কারণে তাঁর কণ্ঠ ফ্যাসফ্যাসে। তারপরও আমার মনে হচ্ছে শিশুকালের সেই কিন্নর কণ্ঠ শুনছি।
ছবি প্রসঙ্গ: এটি যেদিন গান শুনে ঘুমিয়েছিলাম সেদিনের নয়। কিছুদিন আগে এক দুপুরে আম্মার পাশে শুয়েছিলাম। তখন আমার অজান্তেই ভাগ্নি জামাই রাসেল ছবিটি তুলেছিল। আমি ছিলাম নিদ্রাতুর, তাই টের পাইনি। আম্মা জেগেছিলেন মনে হচ্ছে। এটি পরিকল্পিতভাবে তোলা নয়- তাই অগোছালো। ভাবলাম মায়ের সাথে ছবি এত গোছালো হওয়ার দরকার কী!