• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন

উত্তরের বন্যার পেছনে ভারতের নীল নকশা

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

তিস্তা নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এক দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই নদীর পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থাকার ফলে বাংলাদেশ যেমন শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ধুঁকছে, তেমনি বর্ষা মৌসুমে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দেওয়ার ফলে আকস্মিক বন্যার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরের জনপদ। চলতি জুন মাসে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফর এবং সেখানে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতের একতরফা পানি ছাড়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ একে নিছক ‘প্রকৌশলগত বাস্তবতা’ বলে মানতে নারাজ; বরং এর পেছনে তারা দেখছেন চীনকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের ছায়া।

ঘটনার শুরু হয় জুনের শেষ সপ্তাহে, যখন ভারতের গজলডোবা বাঁধের ২০টি গেট খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে তিস্তার পানির প্রবল স্রোত হুড়মুড় করে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে বাংলাদেশও তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দিতে বাধ্য হয়। ফলে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলের নিচু এলাকাগুলো তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ঐতিহাসিকভাবেই জুন-জুলাই মাস বর্ষার সময়, ফলে উজানের ঢল স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবার এই বিশেষ সময়ে কেনইবা পানি ছাড়ার ক্ষেত্রে তথ্যের সমন্বয়হীনতা দেখা যায়? ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের নিজ অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যারেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা পানি ছাড়তে বাধ্য। কিন্তু প্রকৌশলগত এই যুক্তির চেয়েও এখানে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাই বড় হয়ে উঠেছে।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ চীনের সাথে দীর্ঘদিনের। ভারত বরাবরই চাইছে না তিস্তা অববাহিকায় চীনের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকুক। কারণ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য তিস্তা অববাহিকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত তিস্তা অববাহিকাকে তাদের ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা বলয় হিসেবে মনে করে। ফলে এই এলাকায় চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখনই বাংলাদেশ তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের সাথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দিকে অগ্রসর হয়, তখনই দেখা যায় পানি প্রবাহের ইস্যুটি হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এটি কি একটি কাকতালীয় ঘটনা, নাকি ভারতের পক্ষ থেকে একটি নীরব সংকেত?

তিস্তা চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের পারদকে বারবার নিচে নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানির হিস্যা চেয়ে আসছে, যা তিস্তা ব্যারেজের মূল উদ্দেশ্য। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের সাথে পানি বণ্টন নিয়ে কোনো কার্যকর চুক্তি না থাকায়, ভারত পানি প্রবাহের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে উজানের দেশ ভাটির দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে পারে না। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ভারত সবসময়ই তার জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেকগুলো প্রজেক্ট নিয়ে অগ্রগতি হলেও তিস্তা ইস্যুটি সবসময়ই একটি ‘হট পটেটো’ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাঁধ নির্মাণের আগে তিস্তায় বন্যা হতো প্রাকৃতিকভাবে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতো। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করায় এখন পানির প্রবাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখা—এই দুইয়ের চাপে বাংলাদেশের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া নদী ড্রেজিংয়ের অভাবে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য ঢলেই এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে যে, এবারের বৃষ্টিপাত স্থানীয় পর্যায়ের, তাই দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা কম। তবে উজানের পানির চাপ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আকস্মিক বন্যা ঠেকানো বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের মধ্যে এক প্রকার অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে। বাংলাদেশ এখন এক কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। একদিকে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের বিশাল বিনিয়োগের লোভ—এই দুইয়ের মাঝে তিস্তা প্রকল্প একটি জটিল বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যদি ভারত মনে করে যে, এই পানি ছাড়ার মাধ্যমে তারা তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে, তবে সেটি বাংলাদেশের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করবে। কারণ, পানি একটি মানবিক অধিকার। এটিকে ভূ-রাজনৈতিক দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করার মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে।

উপসংহারে বলা যায়, কেবল ভারত কিংবা কেবল বাংলাদেশ—কোনো এক পক্ষকে দায়ী করে তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা চুক্তি। ভারতের উচিত গজলডোবার তথ্য আগেভাগে বাংলাদেশের সাথে শেয়ার করা এবং বাংলাদেশের উচিত নদী ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত যদি সত্যিই উদ্বিগ্ন থাকে, তবে তাদের উচিত বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া—যেখানে তারা নিজেরাই অর্থায়ন করতে পারে অথবা যৌথ ব্যবস্থাপনায় নদীটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। ভারত-চীন ভূ-রাজনীতির চেয়েও বড় হওয়া উচিত উত্তরের কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। তিস্তা নিয়ে খেলার পরিণতিতে যদি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরে, তবে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে। এটি কেবল একটি প্রকল্পের প্রশ্ন নয়, এটি দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। তাই পানি প্রবাহের রাজনীতি বন্ধ করে এখন সময় এসেছে তিস্তাকে বাঁচানোর এবং দুই দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতির জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজে বের করার।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category