সারাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দিজীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে শনিবার ঈদুল ফিতরের উৎসবমুখর আমেজ ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে বন্দি থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ আমলারাও এই আয়োজনের অংশ হতে যাচ্ছেন। এই প্রথমবারের মতো বিশেষ এই কারাগারে ঈদ উদযাপন করতে যাওয়া এসব হাই-প্রোফাইল বন্দিদের কাছে এরই মধ্যে তাদের পরিবারের পাঠানো নতুন পোশাক পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দুস্থ বন্দিদের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করতে কারা কর্তৃপক্ষ এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি ও গেঞ্জিসহ নতুন কাপড় সরবরাহ করা হয়েছে। পুরো কারাগার জুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা নজরদারি।
কারাবন্দিদের ঈদের দিনটিকে কিছুটা আনন্দদায়ক করতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এবং এআইজি মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ। নিয়ম অনুযায়ী ঈদের নামাজ আদায়ের পর সবার জন্য বিশেষ ও উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। বিশেষ এই কারাগারে বিনোদনের সুযোগ কিছুটা সীমিত হলেও সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের অংশগ্রহণে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা দর্শক হিসেবে উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি মানবিক দিক বিবেচনা করে ঈদের তিন দিনের মধ্যে যেকোনো এক দিন বন্দিদের নিজ পরিবারের সঙ্গে বিনামূল্যে তিন মিনিট মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে নিয়ম মেনে স্বজনরা সরাসরি সাক্ষাৎ করার এবং বাসা থেকে রান্না করে আনা খাবার পরিবেশন করারও অনুমতি পাবেন। ঈদের দিন সকালে আইজি প্রিজনস নিজে কারাগার পরিদর্শন করে বন্দি ও কারারক্ষীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন বলেও জানা গেছে।
কেরানীগঞ্জের এই বিশেষ কারাগারে বন্দি আছেন আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, শাজাহান খান, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল ইসলাম, টিপু মুনশি, আতিকুল ইসলামসহ মোট ১২৩ জন প্রভাবশালী রাজনীতিক, মন্ত্রী, এমপি ও সাবেক আমলা। সাধারণ নিয়মে এরা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা ওয়ার্ডে কঠোর নজরদারিতে থাকেন এবং একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ পান না। তবে ঈদের দিন কারাগারের অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিতব্য বিশাল জামাতে তারা একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ পাবেন। কারা কর্তৃপক্ষের মতে, চার দেয়ালের বন্দিজীবনে এসব শীর্ষ নেতাদের এক কাতারে সমবেত হওয়ার এই দৃশ্যটি হবে একেবারেই বিরল।
এই বন্দিদের ভিড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমীকরণে রয়েছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। জুলাইয়ের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজের দোষ স্বীকার করে তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন এবং ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডের সাজা থেকে রেহাই পেয়ে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে। রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে অন্যান্য সব বন্দির দৃষ্টিসীমার বাইরে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কক্ষে রাখা হয়। তবে আসন্ন ঈদে তিনি অন্য সবার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত সাপেক্ষে তাকে এই জামাতে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।