• শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ অপরাহ্ন
Headline
এআই নজরদারিসহ নতুন অবকাঠামোয় বদলে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন কার্যক্রম সারাদেশে ৩ মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান শুরু কাল, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অবকাঠামোগত জৌলুস বনাম আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির সক্ষমতা সংকট জাপানি ঋণে সুদ ৫ বছরে ৪ গুণ কী লুকাচ্ছে রূপপুর? ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রেই বিকল সোলার সিস্টেম: অবহেলায় নষ্ট শত শত কোটি টাকার সৌর প্রযুক্তি বিহারের আপত্তি বনাম ঢাকার অধিকার: কোন পথে গঙ্গাচুক্তি? টুইন টাওয়ারের ছাই থেকে ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র: নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর রাজপথে নতুন মেরুকরণ: বিভাগীয় লংমার্চে জামায়াত ও এনসিপির শক্তি পরীক্ষার রাজনীতি

কী লুকাচ্ছে রূপপুর?

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে যখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদর, ঠিক তখনই গভীর রাতে প্রকল্পের ভেতরের প্রশাসনিক ভবনে ছড়িয়ে পড়া আগুনের লেলিহান শিখা পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে এক নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে| রোববার গভীর রাতের সেই অগ্নিকাণ্ড কেবল সার্ভার আর আসবাবপত্র পুড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং টানা ৪২ ঘণ্টার এক দীর্ঘ ডিজিটাল ও বৈদ্যুতিক ব্ল্যাকআউটের জন্ম দিয়ে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগাপ্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাবলয়কে এক লহমায় ধসিয়ে দিয়েছে| যে জাতীয় প্রকল্পে একটি সামান্য নাট-বল্টু বা স্ক্রু খুলতেও মস্কোর অনুমোদিত নকশা এবং রুশ প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক, সেখানে একটি সাধারণ সার্ভার রুম ও প্রশাসনিক ভবনে কীভাবে এমন বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে এবং শত শত কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ছাই হয়ে যেতে পারে—তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে|
ঘটনার ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের রূপপুরস্থ ‘পায়োনিয়ার বেইজ’ এলাকায় আগুনের সূত্রপাত ঘটে| তবে প্রকল্পের সংবেদনশীলতা এবং কর্তৃপক্ষের গোপনীয়তার কারণে ঘটনাটি সর্বসাধারণের নজরে আসে ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার| বিভিন্ন তথ্যের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, অগ্নিকাণ্ডের মূল উৎস ছিল ভবনের কেন্দ্রীয় সার্ভার রুম| সেখান থেকে আগুনের উত্তাপ ও ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সংলগ্ন প্রশাসনিক কক্ষে| ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে| কিন্তু অগ্নিনির্বাপণ সম্পন্ন হওয়ার পরেই শুরু হয় মূল প্রশাসনিক বিপর্যয়| একটি মাত্র কক্ষে আগুনের সূত্রপাত হলেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভবনের বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সমগ্র স্থাপনা জুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে| মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৪২ ঘণ্টা ধরে পুরো প্রকল্প এলাকা অন্ধকার ও নেটওয়ার্কহীন অবস্থায় স্থবির হয়ে থাকে| ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটকে দায়ী করলেও তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না|
নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুরের এই ঘটনাকে কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই| এর পেছনে একটি বিপজ্জনক পুনরাবৃত্তি বা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে| বিগত দিনগুলোর রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর দুপুরে পদ্মার তীরে প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় কাঠের বিশাল স্তূপে আকস্মিক আগুন লাগে, যা নেভাতে গ্রিন সিটি ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিটকে টানা ৪০ মিনিট লড়াই করতে হয়েছিল| তারও পূর্বে প্রকল্পের মূল সাব-কন্ট্রাক্টর ম্যাক্স কোম্পানির ২৯ নম্বর অফিসের কন্টেইনারে একই ধরনের আগুন লেগেছিল, যার নেপথ্যেও পাওয়ার সাপ্লাই বোর্ডের শর্ট সার্কিটকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়| এমনকি ২০২৩ সালে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রাশিয়া থেকে আকাশপথে আসা রূপপুর প্রকল্পের প্রায় ১৮ টন মূল্যবান বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রহস্যজনক আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়| লক্ষণীয় বিষয় হলো, আগুন কখনোই মূল চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর ভবনে লাগছে না; আগুন বারবার আঘাত হানছে বাইরের সহায়ক অবকাঠামো, কন্টেইনার কিংবা প্রশাসনিক ডেটা সেন্টারে| নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষায় এটি হলো ‘সহায়ক কাঠামোর চরম ব্যর্থতা’| অর্থাৎ মূল দুর্গটি বাহ্যিকভাবে সুরক্ষিত হলেও তার চারপাশের নিরাপত্তা প্রাচীরে একের পর এক ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠছে|
প্রশ্ন উঠছে, প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি খরচে নির্মিত এই অত্যাধুনিক প্রকল্পে কীভাবে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে| পায়োনিয়ার বেইজের সার্ভার ও আইটি অবকাঠামো চব্বিশ ঘণ্টা সচল থাকে, যেখানে একই সঙ্গে হাই-ভোল্টেজ এয়ার কন্ডিশনার, রাউটার এবং জটিল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কাজ করে| বুয়েটের তড়িৎ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ লোড অডিট বা বিদ্যুৎ প্রবাহের সক্ষমতা যাচাই না করে পুরোনো ক্যাবলিং ব্যবস্থার ওপর যদি অতিরিক্ত ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক যন্ত্রাংশ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে লাইন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে মারাত্মক স্ফুলিঙ্গ তৈরি হওয়া অনিবার্য| এটি শুধু নিছক কারিগরি শর্ট সার্কিট নয়, বরং এটি দায়িত্বশীল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার এক চরম অবহেলা| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অগ্নিনির্বাপণের সেকেলে মানসিকতা| বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার বা সার্ভার রুমের মতো স্পর্শকাতর স্থানে পানি দিয়ে আগুন নেভানোর রীতি সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য, কারণ পানি মানেই শর্ট সার্কিট দ্বিগুণ হওয়া এবং সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক মেমোরির চিরতরে ধ্বংস সাধন| আন্তর্জাতিক পারমাণবিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ ধরনের ডেটা সেন্টারে ‘এফএম-২০০’ বা সমমানের পরিবেশবান্ধব গ্যাসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নির্বাপক ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক, যা মুহূর্তের মধ্যে অক্সিজেন টেনে নিয়ে পানি ছাড়াই আগুন দমিয়ে দেয়| পাশাপাশি সেখানে ধোঁয়া দৃশ্যমান হওয়ার আগেই বাতাসে আয়নের পরিবর্তন শনাক্তকারী ‘ভেসডা’ (VESDA) সেন্সর থাকা আবশ্যক ছিল| রূপপুরের স্নায়ুকেন্দ্রে এই মৌলিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আদৌ সচল ছিল কি না, তা এখন সবচেয়ে বড় তদন্তের বিষয়|
এর পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের ঘাটতি এবং সেকেলে কাগজের ফাইলের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা এক ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি করেছে| একটি সামান্য স্ফুলিঙ্গ যেখানে স্তূপীকৃত নথিপত্র পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, সেখানে রূপপুরের বহু স্পর্শকাতর ঠিকাদারি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এখনো কাগজের ফাইলে বন্দি| ২৪০০ মেগাওয়াটের এই মেগাপ্রকল্পে দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট| চলতি ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার পর আগামী নভেম্বরের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের চূড়ান্ত ক্ষণ গণনা চলছে| এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে যদি প্রকল্পের নিরাপত্তা লগ, যন্ত্রাংশের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র, আমদানিকৃত চালানের তালিকা কিংবা সাব-কন্ট্রাক্টরদের কাজের হিসাবের মূল কপি পুড়ে যায় এবং তার কোনো নির্ভরযোগ্য ক্লাউড ব্যাকআপ না থাকে, তবে তার খেসারত দিতে হবে গোটা জাতিকে| এর ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত নিরীক্ষা ব্যাহত হবে, নির্মাণ ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি পাবে এবং সেই বাড়তি আর্থিক লোকসানের চূড়ান্ত দায় গিয়ে চাপবে সাধারণ ভোক্তার ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ বিলের ওপর|
পারমাণবিক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর ও উদ্বেগজনক| অনেকেই ভাবছেন চুল্লি অক্ষত থাকলে আগুন লাগায় দেশের কোনো ক্ষতি নেই| কিন্তু আধুনিক পারমাণবিক প্রকৌশলে তথ্য ও ডেটা ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে একটি ‘নীরব বিপর্যয়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়| চুল্লিতে সরাসরি বিস্ফোরণ না ঘটলেও কোন সময়ে কোন ভাল্‌ভটি খোলা হয়েছিল, কে কোন যন্ত্রটি কীভাবে পরিচালনা বা মেরামত করেছিল—তার ডিজিটাল লগ যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যত অন্ধ করে দেয়| এটিকে বিশেষজ্ঞরা রূপক অর্থে ‘ডিজিটাল চেরনোবিল’ বা নথিপত্র পুড়িয়ে প্রমাণ ধ্বংস করার এক মারাত্মক ফাঁদ হিসেবে দেখছেন| পায়োনিয়ার বেইজে বহু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উপ-ঠিকাদার কাজ করেন, যাদের বিল-ভাউচার ও মেজারমেন্ট বুকের মতো অর্থনৈতিক নথিপত্র দীর্ঘদিন ধরে ম্যানুয়ালি সংরক্ষিত ছিল| স্বচ্ছ অডিট বা আর্থিক নিরীক্ষা এড়াতে কিংবা বিল বাড়ানোর পথ সুগম করতে এই আগুনের সুযোগ নেওয়া হয়েছে কি না, সেই সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যায় না|
এই সংকটের বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের জন্য সরকারকে অবিলম্বে কিছু জ্বলন্ত প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব জাতির সামনে প্রকাশ করতে হবে| প্রথমত, সার্ভার রুমে বিশ্বমানের গ্যাসভিত্তিক নির্বাপক সিস্টেম ছিল কি না তার আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ দেখাতে হবে| দ্বিতীয়ত, ঠিক কোন কোন গোপন নথি, ঠিকাদারি ফাইল কিংবা কারিগরি ডেটা পুড়ে গেছে তার একটি সরকারি ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে| তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের জন্য বিমা কোম্পানির কাছে ঠিক কত টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হচ্ছে তা পরিষ্কার করতে হবে, কারণ আর্থিক দাবির অঙ্কই স্পষ্ট করে দেবে আগুনের প্রকৃত গভীরতা কতখানি ছিল| ছয় ফুট পুরু কংক্রিট আর তিন ফুট ইস্পাতের সুদৃঢ় গম্বুজ হয়তো বাইরের বিমান হামলা প্রতিহত করতে পারে, কিন্তু সেই দুর্ভেদ্য চুল্লিটি যারা পরিচালনা করেন সেই মানুষ এবং পরিচালনার মূল প্রাণভোমরা হলো নিরাপদ তথ্যপ্রবাহ| তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা যেখানে অরক্ষিত, সেখানে স্টিলের গম্বুজও কোনো দেশকে স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে না| রূপপুরের এই আগুন তাই কোনো মামুলি শর্ট সার্কিটের গল্প নয়, এটি একটি মেগাপ্রকল্পের স্বচ্ছতা, ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার চূড়ান্ত অ্যাসিড টেস্ট|
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category