সমাজে টিকে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। নিম্নবিত্তদের জন্য সরকারের নানা ধরনের সহায়তা বা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে, উচ্চবিত্তদের জন্য রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা। কিন্তু এই দুই শ্রেণির মাঝখানে থাকা মধ্যবিত্তরা যেন সরকারের কোনো হিসাবেই নেই। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে নীরব এক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এর মধ্যে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্তের ঘাড়ে নতুন বোঝার সৃষ্টি করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবিত্ত এমন এক শ্রেণি, যারা নিজেদের কষ্টের কথা রাস্তায় নেমে স্লোগান দিয়ে বা মিছিলে গিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু বাজারের লাগামহীন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে এই শ্রেণিটিই।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সমন্বয়ের অভাব
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। তবে অন্যান্য দেশ বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত দাম সমন্বয় করলেও বাংলাদেশে হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল পুরো অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়ায় এর দাম বৃদ্ধির প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যখন কিছুটা নিম্নমুখী, তখনও দেশের বাজারে বাড়তি চাপ কেন রাখা হচ্ছে, তার কোনো সদুত্তর নেই। সরকার চাইলে তেলের ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাটের বোঝা কিছুটা কমিয়ে দামের সমন্বয় করতে পারত। কিন্তু কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই দাম বাড়ানোর ফলে মধ্যবিত্তের ওপর এর সরাসরি অভিঘাত এসে পড়ছে।
মূল্যস্ফীতির চেইন রিঅ্যাকশন
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং সেবামূল্য—সবকিছুরই দাম বেড়ে যায়। ২০২২ সালেও এ ধরনের বড় মূল্যবৃদ্ধির পর যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে এই চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অর্থনীতি সরল রেখায় চলে না; উৎপাদন খরচে জ্বালানির প্রভাব সামান্য হলেও পরিবহন খরচের অজুহাতে বাজারে পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হয় সাধারণ ক্রেতাকে।
অর্থনীতির বহুমুখী চাপ ও সংস্কারের তাগিদ
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিও বর্তমানে একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-সহ উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও কর ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছে। নতুন করে ঋণের জন্য আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে সরকারকে, যার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে কঠিন শর্ত। সংস্কারের অভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে অর্থায়নের পথ আরও কঠিন হবে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ
এ অবস্থায় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বড় বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে:
জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত কর ও ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা।
কৃষিতে ভর্তুকি, সেচ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন ব্যয় কমানো।
নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের জন্যও রেশনিং বা বিশেষ সুরক্ষা বলয়ের ব্যবস্থা করা।
অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমিয়ে কর্মসংস্থানমুখী খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি শুধু জিডিপি বা প্রবৃদ্ধির সংখ্যার হিসাব নয়। সাধারণ মানুষের জীবনমান এবং মধ্যবিত্তের টিকে থাকার এই নীরব সংগ্রামকে হিসেবে না ধরলে অর্থনৈতিক সংকট ভবিষ্যতে আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।