• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩২ অপরাহ্ন
Headline
বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের ‘সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে’: সংসদে রুমিন ফারহানা কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল ইসরায়েলের অকুণ্ঠ প্রশংসায় ট্রাম্প, ঘনাচ্ছে নতুন বিতর্ক ‘ইরানকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ট্রাম্প কে?’: পেজেশকিয়ান

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ল

Reporter Name / ৫ Time View
Update : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

দেশে আরেক দফা বাড়ানো হলো সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসান কমানো এবং দেশের বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার যুক্তি দেখিয়ে এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন ভোক্তাদের কিনতে হবে ১১৫ টাকায়। অন্যদিকে, প্রতি লিটার অকটেনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা। শনিবার দিবাগত রাত ১২টা (অর্থাৎ রোববার, ১৯ এপ্রিল) থেকেই দেশজুড়ে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে। এর ফলে রাতারাতি পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তীব্র আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতির হার আরও কয়েক ধাপ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিম্ন, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

সরকারের ব্যাখ্যা ও বিপিসির অবস্থান

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে তেল আমদানি করতে গিয়ে বিপিসিকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই লোকসান সামাল দিতে গিয়ে বিপিসির আর্থিক কাঠামো চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। সরকার সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভর্তুকির চাপ কমাতে অনেকটা বাধ্য হয়েই এই বিশাল মূল্য সমন্বয়ের পথে হেঁটেছে। পাশাপাশি বাজারে তেলের সরবরাহ ও মজুত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে সংকট বা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনেও এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। বিপিসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে ডিজেলের মোট চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে। চলতি এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ টন। কিন্তু বর্তমানে কার্যকর মজুত রয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টনের মতো। এর বাইরে আরও এক লাখ টন ডিজেলবাহী চারটি জাহাজ দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। জরুরি ব্যবহারের জন্য প্রায় ৮০ হাজার টন ডিজেল রিজার্ভ বা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সরবরাহ কম থাকায় এপ্রিলে দৈনিক গড় বিক্রি ১১,১০৭ টনে নেমে এসেছিল, যা পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়িয়ে প্রায় ১৩ হাজার টনে উন্নীত করা হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ১১,৮৬২ টন। অন্যদিকে অকটেনের সরাসরি কোনো সংকট না থাকলেও চাহিদার ব্যাপক চাপ রয়েছে। বর্তমানে দেশে ২৯,৪৮৪ টন অকটেন মজুত আছে, যা আগামী ২৫ দিনের জন্য পর্যাপ্ত। গ্রাহক পর্যায়ে চাপ কমাতে দৈনিক সরবরাহ ১,১২৯ টন থেকে বাড়িয়ে ১,৩৬৬ টন করা হচ্ছে। পেট্রোলের মজুত রয়েছে ১৮,৮৩০ টন। পেট্রোলের দৈনিক সরবরাহও বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর স্বাভাবিকভাবে জ্বালানির চাহিদা ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়লেও, এ বছর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানুষের মধ্যে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে কেনার প্রবণতার কারণে চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ডলার সংকট

জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা একটি বড় কারণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের আক্রমণের কারণে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী ও বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোতে অস্থিরতার কারণে তেলের জাহাজগুলোর পরিবহন খরচ এবং ইন্স্যুরেন্স বা বীমা প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে বিপিসিকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে এবং উচ্চ পরিবহন ব্যয়ে তেল আমদানি করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশে তীব্র ডলার সংকট। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং ডলারের রেট বেড়ে যাওয়ার কারণে তেল আমদানিতে বিপিসিকে দেশীয় মুদ্রায় বিপুল পরিমাণ বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।

তবে সমালোচক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপিসি গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যখন কম ছিল, তখন জ্বালানি তেল বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। সেই মুনাফার টাকা দিয়ে বর্তমানের এই সংকটকালীন সময়ে অনায়াসেই ভর্তুকি দেওয়া যেত। বিপিসির সেই তহবিলের একটি বড় অংশ সরকার অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করার কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তলানিতে ছিল, তখন দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি। জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বারবার এ বিষয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড প্রাইসিং ফর্মুলা চালুর কথা বলে আসছিলেন, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতি মাসে দাম সামান্য সমন্বয় করা হবে। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে একলাফে এতটা দাম বাড়ানোকে অনেকেই ‘অযৌক্তিক’ বলে আখ্যায়িত করছেন।

পরিবহন খাত ও নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব

জ্বালানি তেলের এই ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের পরিবহন খাতে। দেশে গণপরিবহন এবং পণ্য পরিবহনের মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজেল। ডিজেলের দাম একলাফে এতটা বেড়ে যাওয়ায় বাস, ট্রাক, লঞ্চ, কাভার্ডভ্যানসহ সব ধরনের পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়াটা এখন অবধারিত। পরিবহন মালিকরা ইতোমধ্যেই ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলতে শুরু করেছেন এবং অনেক জায়গায় অঘোষিতভাবে বেশি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজিসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে। পরিবহন খাতে নৈরাজ্য রোধে সরকারের জোরালো তদারকি না থাকলে সাধারণ যাত্রীরা চরম হয়রানির শিকার হবেন।

কৃষি ও সেচ খাতে নেতিবাচক প্রভাব

কৃষি খাতে ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশে সেচকাজের জন্য ব্যবহৃত পাম্পগুলোর বড় অংশই গ্রামীণ এলাকায় ডিজেল দিয়ে চালানো হয়। বিশেষ করে সেচনির্ভর বোরো মৌসুম বা আসন্ন অন্যান্য ফসলের আবাদে সেচ খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এছাড়া জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর ও ফসল মাড়াইয়ের যন্ত্রপাতির ভাড়াও বাড়বে। কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে কৃষিপণ্যের দামও বাড়বে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এই অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকরা যদি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পান, তবে তারা কৃষিকাজে উৎসাহ হারাতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতে গভীর উদ্বেগ

শিল্প খাতে বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক বা আরএমজি (RMG) সেক্টরে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কারখানার জেনারেটর চালানো, বয়লার পরিচালনা এবং বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের জন্য শিল্প খাতে প্রচুর পরিমাণে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এমনিতেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে তারা এক কঠিন সময় পার করছেন। এর মধ্যে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। টেক্সটাইল খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই তেলের দাম বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বা কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আগামী মৌসুমের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের সাথে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ভারতে চলে যেতে পারে। এতে দেশের ডলার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, লিটারপ্রতি ডিজেলে ১১৫ টাকা, অকটেনে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলে ১৩৫ টাকা নির্ধারণের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ধাক্কা। সরকার যদিও বলছে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় এবং সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতেই এই পদক্ষেপ, তবে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিকে কতটা গভীর সংকটে ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত সবাই। পরিবহন, কৃষি এবং শিল্প—অর্থনীতির এই তিনটি প্রধান স্তম্ভতেই যখন একযোগে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বাড়বে, তখন দিন শেষে এর পুরো আর্থিক দায়ভার মেটাতে হবে সাধারণ ভোক্তাদেরকেই। সরকারের এখন উচিত বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোরদার করা, যাতে তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিমুনাফা লুটতে না পারে। একইসঙ্গে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের বাঁচাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে দ্রুত নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category