ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এশিয়ার পরাশক্তি চীনের বেইজিংয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বিশ্বের দুই ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী ১৯ ও ২০ মে (মঙ্গলবার ও বুধবার) দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন পুতিন। শনিবার (১৬ মে) চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এবং ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে পৃথক বিবৃতিতে এই হাই-প্রোফাইল সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত বেইজিং সফর শেষ হওয়ার ঠিক পরদিনই ক্রেমলিনের এই ঘোষণা বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান ‘বার্নিং টপিক’ বা উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে ওয়াশিংটন তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতির মাঝেই এক ঝাঁক মার্কিন বিলিয়নিয়ারদের সঙ্গে নিয়ে বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বেশ কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ইরান সংঘাত এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের কাছ থেকে কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক সুবিধা বা ব্রেকথ্রু না পেয়ে কার্যত ‘খালি হাতে’ ওয়াশিংটনে ফিরেছেন ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসনের এই ব্যর্থতার পর পরই ইরানের অন্যতম প্রধান ‘হিডেন অ্যালাই’ বা গোপন মিত্র রাশিয়া ও চীনের এই শীর্ষ বৈঠক ওয়াশিংটনের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুতিনের এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এই চুক্তিকে সামনে রেখে দুই নেতা বৈঠক করবেন।
দুই দিনব্যাপী এই সফরে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছাড়াও চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে পুতিনের একটি বিশেষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে; যেখানে মূলত দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রও স্বাক্ষরিত হবে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া। অন্যদিকে, পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা ও আমদানিকারক হলো চীন। ফলে, এবারের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার উপায়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে।
এর পাশাপাশি, পর্দার অন্তরালে সবচেয়ে বড় এজেন্ডা হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ইরান ইস্যু। পশ্চিমা অক্ষকে মোকাবিলায় বেইজিং ও মস্কো কীভাবে তাদের যৌথ কৌশলগত অবস্থান সাজাবে, তা এই বৈঠক থেকেই নির্ধারিত হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্ষিপ্ত এক বার্তায় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশেষ আমন্ত্রণে পুতিন এই সফরে আসছেন। দুই রাষ্ট্রপ্রধান যৌথভাবে ২০২৬-২০২৭ সালের ‘রাশিয়া-চীন শিক্ষা বর্ষ’-এরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ট্রাম্পের বিদায় এবং পুতিনের আগমন—বেইজিংয়ের এই চতুর কূটনৈতিক চাল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।