• সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

বাবার ৪টি স্মৃতি: ৪টি শিক্ষা

বাদল সৈয়দ / ২ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

আমার বাবা কখনো সামনে বসিয়ে গম্ভীরমুখে উপদেশ দিতেন না। তিনি দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কথা বলতেন। এখন মনে হয়, এগুলোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপদেশ আর কিছু হয় না।
১) তিনি চাকরি করতেন কাস্টমসে। একবার সরকার জব্দ করা কিছু টেপরেকর্ডার নামমাত্র মূল্যে কাস্টমস কর্মীদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এত কম দামে টেপরেকর্ডার কেনার সুযোগ দেখে আমি বাবার কাছে আবদার করলাম একটি কিনে দেওয়ার। তিনি বললেন—
‘বাবা, বাজারে যদি পাঁচ টাকা দিয়ে হাতি বিক্রি করে, তুমি যদি তা কিনো, সেটা হবে অপচয়। কারণ তোমার হাতির দরকার নেই। ঠিক একইরকমভাবে বাসায় একটি টেপরেকর্ডার থাকার পরও আরেকটি কেনা মানে অপচয়। তা যত কমদামেই কেনা হোক না কেন।’
২) ক্লাস সিক্স/সেভেনে পড়ি। বাবার সাথে রিকশা করে চট্টগ্রামের জলসা সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। সেখানে নায়িকার বিশাল বিশাল পোস্টার ঝুলছে। কিশোর মনের কৌতূহলে আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি। বাবা মৃদু কণ্ঠে বললেন— ‘মেয়েদের দিকে ওভাবে তাকাতে নেই, ছবি হলেও না। এটা অভদ্রতা।’
৩) আমার বড় আপা ক্লাস টেনে পড়া অবস্থাতেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বছর পর দুলাভাই মারা গেলেন। বাবা আপাকে বাসায় নিয়ে এসে প্রাইভেটে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারপর তাঁকে বললেন— ‘মা, তোমার এবং তোমার বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। তবে তোমাকে পড়ানোর ক্ষমতা আছে। তুমি যদ্দুর পড়তে চাও পড়ো। মধ্যবিত্তদের উঠে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় হলো পড়ালেখা।’
বড় আপা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সম্মানজনক চাকরি করে কিছুদিন আগে অবসরে গেছেন।
৪) আমার স্কুলে যাওয়ার পোশাক ছিল সাদা শার্ট এবং সাদা পায়জামা। আব্বা সেগুলো মাড় দিয়ে নিজ হাতে ধুয়ে দিতেন। তারপর ইস্ত্রির বিকল্প হিসেবে ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিতেন।
মাড় দেওয়া পোশাক পরলে গরম লাগত বলে আমি খুব বিরক্ত হতাম। বাবা বলতেন— ‘মানুষ তোমাকে প্রথম বিবেচনা করবে পোশাক দিয়ে। এটিই অপ্রিয় সত্য। একটি কথা মনে রাখবে, মলিন পোশাকের মানুষকে অন্যরা সহানুভূতি দেখায় না। বরং অবজ্ঞা করে। তাই যত সমস্যাতেই থাকো, পোশাকে ফিটফাট থাকবে।’
আব্বা, বিশ বছর আগে আপনি চলে গেছেন, কিন্তু আমি প্রতিদিন আপনার সাথে কথা বলি। আপনি কী তা শুনতে পান?
দয়া আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।
পাদটীকা: বড় আপার জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর আব্বা তাঁর বাকি তিন মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেননি। তাঁদের বিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category