তিন দশক আগে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ সমাপ্তির চূড়ান্ত ক্ষণ দ্রুত ঘনিয়ে আসছে| ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মেয়াদ আগামী ১১ ডিসেম্বর শেষ হতে চলেছে| কিন্তু দীর্ঘ ৩০ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ শেষের দ্বারপ্রান্তে এসে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং নদীতীরবর্তী রাজ্যগুলোর স্বার্থের সংঘাত অভিন্ন নদীর হিস্যা নিয়ে নতুন করে তীব্র টানাপড়েন তৈরি করেছে| চুক্তিটির অন্ধ নবায়নের পরিবর্তে এবার গোড়া থেকেই এর প্রতিটি শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্বিবেচনা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট ‘নিশ্চয়তা ধারা’ বা গ্যারান্টি ক্লজ পুনর্বহালের দাবি বাংলাদেশে জোরালো হচ্ছে| বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম শরিক দলগুলোর আঞ্চলিক বিরোধিতা এবং রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার দাবি দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথকে জটিল করে তুলছে| দুই দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এমন এক স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো শীর্ষ কূটনৈতিক সংলাপ শুরু না হওয়া বিষয়টিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে|
ভারতের অভ্যন্তরে এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ তীব্র আকার ধারণ করেছে| বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় জোট সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী অংশীদার জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডিইউ গঙ্গার বর্তমান পানিবণ্টনের রূপরেখা নিয়ে চরম আপত্তি তুলেছে| বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও জেডিইউ নেতারা সরাসরি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করে দাবি করেছেন যে, ১৯৯৬ সালের চুক্তির কারণে বিহারের কৃষিকাজ ও নদীকেন্দ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| তাঁরা আগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিহারের অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন| শুধু নীতিগত আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে গঙ্গার তীরবর্তী বিহারের অন্তত ১২টি জেলায় চুক্তিটির বিরোধিতায় জনমত গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে দলটি| শরিক দলের এই চাপের মুখে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি জেডিইউ সভাপতি সঞ্জয় কুমার ঝাকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে আশ্বস্ত করেছেন যে, জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার কাজ চলছে| এর আগে ২০২৪ সালেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোকে বাইরে রেখে তিস্তা কিংবা গঙ্গার পানি নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত হবে না|
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের এই ক্রমবর্ধমান আপত্তির বিষয়টিকে অবশ্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছেন| ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হতে হবে সরাসরি দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে, কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে নয়| তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, বিহারের এই কথিত উদ্বেগ অমূলক, কারণ গঙ্গার অববাহিকায় ফারাক্কার বহু উজানে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোই বড় বড় ব্যারেজ ও খালের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে| ফলে বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক এবং দিল্লির শীর্ষ রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে| বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গের এই আপত্তির বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক সময় দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশকে বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার একটি কার্যকর দর-কষাকষির কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করে থাকে|
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজে পৌঁছানো পানির প্রবাহকে নির্দিষ্ট সূত্রে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া| সাধারণত বর্ষাকালে নদীতে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত পানির প্রবাহ বজায় থাকে, তাই মূলত প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বিস্তৃত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কুষ্টিয়ার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানির পরিমাপ তদারকি করা হয়| তবে বাংলাদেশের গবেষক ও পানি বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের তীব্র অভিযোগ হলো, ১৯৭৭ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফারাক্কায় যে পরিমাণ পানিই আসুক না কেন বাংলাদেশের জন্য একটি ন্যূনতম নির্দিষ্ট হিস্যা পাওয়ার ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা সুরক্ষামূলক ধারা রাখা হয়েছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়| এছাড়া ফারাক্কার বহু উজানে উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অসংখ্য সেচ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ১৯৯৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সেই উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের বাস্তবতাকে কোনো হিসাবেই আনা হয়নি| ফলে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় পানির মোট আগমন কমে গেলে বাংলাদেশের হিস্যাও মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে, যার চরম খেসারত দিতে হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং সুন্দরবনের লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনাকে|
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও এই চুক্তির আলোচনাকে এক সম্পূর্ণ নতুন আবহে দাঁড় করিয়েছে| ২০২৪ সালের আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ঢাকায় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক ধরনের দৃশ্যমান দূরত্ব ও কূটনৈতিক শৈত্য প্রবাহ চলছে| বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, গঙ্গার চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার এই মুহূর্তে দুই দেশের চলমান অবিশ্বাসের বাতাবরণ দীর্ঘমেয়াদে সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে| তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির চুক্তি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সই হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতার কারণে মনমোহন সিংয়ের আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঢাকা-দিল্লির সুসম্পর্কের চরম সময়েও তা স্বাক্ষরিত হতে পারেনি| তিস্তার সেই অমীমাংসিত ক্ষতকে সামনে রেখে গঙ্গার আলোচনা যাতে নতুন কোনো রাজনৈতিক ফাঁদে না পড়ে, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে|
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) গঙ্গাচুক্তি নবায়নের বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে| ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে, যার গতিপ্রকৃতি ও বণ্টন তদারকির দায়িত্ব এই যৌথ নদী কমিশনের ওপর ন্যস্ত| তবে যৌথ নদী কমিশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, তাদের প্রস্তুতি থাকলেও কেবল কমিশন পর্যায়ের বৈঠকে এই জটিল সমীকরণের নিষ্পত্তি সম্ভব নয়| এটি মূলত একটি উচ্চপর্যায়ের ভূরাজনৈতিক বোঝাপড়া, যা কেবল দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের আন্তরিক রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে| বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. জিএম তারেকুল ইসলামও এই মতকে সমর্থন করে বলেছেন যে, নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত দিক ছাপিয়ে একটি গভীর রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, কাজেই এর স্থায়ী সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই আসতে হবে|
বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও এই বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছে| দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভাটির দেশ হিসেবে নদীর পানিতে বাংলাদেশের অধিকার আন্তর্জাতিক নদী আইনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত| তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেন যে, নতুন চুক্তি হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক নদী আইনের নীতিমালা এবং শুষ্ক মৌসুমে সুনির্দিষ্ট পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক গ্যারান্টি ক্লজের ভিত্তিতে|
জাতীয় পর্যায়ে এই ক্রমবর্ধমান দাবির মুখে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী জাতীয় সংসদে স্পষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন| তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ| সরকার কেবল আনুষ্ঠানিক নবায়নে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং শুষ্ক মৌসুমে পানির সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তার ধারা পুনর্বহাল এবং অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের লক্ষ্যেই দিল্লির সঙ্গে টেবিলে বসবে| এখন দেখার বিষয়, আগামী ডিসেম্বরের সময়সীমা পার হওয়ার আগেই দুই দেশের কূটনীতি এই ঐতিহাসিক নদী সংকট নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে কি না|