বলিউডের পরিচিত মুখ এবং ২০০৯ সালের ‘মিস ইন্ডিয়া’ খেতাবজয়ী অভিনেত্রী পূজা চোপড়ার জন্ম ও শৈশবের গল্প যেকোনো রূপালি পর্দার সিনেমাকেও হার মানায়। সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘তুম হো ন– ঘরকি সুপারস্টার’-এ হাজির হয়ে পূজার মা নীরা চোপড়া মেয়ের জন্মের পর শ্বশুরবাড়ির সেই নির্মম ও পৈশাচিক আচরণের ইতিহাস অশ্রুসিক্ত চোখে স্মরণ করেছেন। তিনি জানান, কন্যাসন্তান হিসেবে জন্ম নেওয়ার অপরাধে পূজাকে জন্মের পর পরই মেরে ফেলার কিংবা অনাথ আশ্রমে ফেলে আসার তীব্র পারিবারিক চাপ ছিল তাঁর ওপর।
নীরার ভাষ্যমতে, বিয়ের পর তাঁদের প্রথম কন্যাসন্তান হওয়ার সময় পরিবারের আচরণ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও, দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি বিষিয়ে উঠতে শুরু করে। তাঁর শাশুড়ি অনবরত মানসিক চাপ দিয়ে বলতেন, পরিবারে সুখ ও বংশের প্রদীপ জ্বালাতে হলে এবার যেন অবশ্যই ছেলে সন্তান হয়।
প্রথম সন্তানের প্রায় সাত বছর পর দ্বিতীয় কন্যাসন্তান হিসেবে ফুটফুটে পূজা চোপড়ার জন্ম হলে নীরার জীবন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়। তিনি জানান, সন্তান প্রসবের পর টানা তিন দিন হাসপাতালের কেবিনে তাঁকে এবং নবজাতককে দেখতে শ্বশুরবাড়ির একটি প্রাণীও আসেনি। এমনকি সদ্যজাত পূজার শরীরে দেওয়ার মতো সামান্যতম কোনো পোশাকের ব্যবস্থাও করেনি তারা। শেষ পর্যন্ত একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য এক সহৃদয় রোগীর পরিবারের আর্থিক ও মানবিক সহায়তায় পূজার জন্য প্রথম কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
জন্মের প্রায় ১০ দিন পর পূজার বাবা হাসপাতালে এলেও কন্যাসন্তানের মুখ দেখে কোনো আনন্দ প্রকাশ করেননি, বরং এক চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর, সন্তান জন্মের মাত্র ১১ দিনের মাথায় প্রসূতি নীরাকে জোরপূর্বক বাড়ির সমস্ত কঠিন কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নীরা চোপড়া জানান, পূজার জন্মের ঠিক ২০ দিন পর থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রতিদিন আলটিমেটাম দিতে শুরু করে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যদি এই পরিবারে নীরাকে থাকতে হয়, তবে এই কন্যাসন্তানকে গলা টিপে শেষ করে দিতে হবে অথবা কোনো অনাথ আশ্রমে রেখে আসতে হবে। একজন মা হিসেবে নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কোনোভাবেই রাজি হননি নীরা।
অবশেষে লোকলজ্জা আর নির্মমতার দেয়াল ভেঙে মাত্র ২১ দিনের একরত্তি শিশু পূজাকে বুকে জড়িয়ে শূন্য হাতে শ্বশুরবাড়ি থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসেন নীরা। সে সময় তাঁর পকেটে ছিল মাত্র ৮১ টাকা। সেই ৮১ টাকা সম্বল করে বড় মেয়ে এবং নবজাতক পূজাকে নিয়ে কলকাতা থেকে সোজা মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি, কারণ তখন তাঁর বাবা-মা মুম্বাইয়ে থাকতেন।
মুম্বাইয়ে এসে দুই কন্যাসন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকেন নীরা। একপর্যায়ে মুম্বাইয়ের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে চাকরির খোঁজে গেলে সেখানে মোনা চাওলা নামের এক মহীয়সী নারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মোনার কাছে নিজের জীবনের সমস্ত নির্মম সত্য ও অসহায়ত্বের কথা খুলে বলার পর, তিনি নীরাকে সেখানে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন।
তাঁর জীবনের প্রথম চাকরির বেতন ছিল মাত্র ৯০০ টাকা। সেই সামান্য অর্থ দিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় এক মায়ের চরম অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। দীর্ঘ ছয় বছর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সততার পুরস্কার হিসেবে পরবর্তীতে ভারতের গোয়া রাজ্যে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান নীরা, যেখানে তাঁর মাসিক বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার টাকায়। মূলত সেখান থেকেই তাঁদের জীবনের মোড় পজিটিভলি ঘুরতে শুরু করে।
আজ দুই যোগ্য মেয়ের আকাশচুম্বী সাফল্যে গর্বে বুক ভরে ওঠে সিঙ্গেল মাদার নীরার। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যদি বারবার আমার জন্ম হয়, তবে আমি ঈশ্বরের কাছে প্রতিবার এই দুটি মেয়েকেই আমার সন্তান হিসেবে চাইব।’ শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার সেই অভিশপ্ত দিনের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘তারা সেদিন আমাকে এই কন্যাসন্তানের জন্য ঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল। যাওয়ার সময় বুক চিতিয়ে বলে এসেছিলাম, একদিন এই মেয়েই আমাকে বিশ্বমঞ্চে গর্বিত করবে। আজ সত্যিই আমার পূজা পুরো ভারতের বুকে আমার মাথা উঁচু করেছে।’