ইদানিং শিশুরা গা শিউড়ে ওঠার মতো বিপদে পড়ছে। প্রতিটি ঘটনা আমাদের বুকে শেলের মতো বিঁধে।
আমি মনে করি, প্রত্যেক মা- বাবা ও অন্যান্য অভিভাবকের এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সতর্ক থাকা উচিত।
শিশুদের নিরাপত্তার প্রথম শর্ত হলো, তিনটি-
ক। সাবধানতা
খ। সাবধানতা
গ। সাবধানতা।
আপনার শিশুকে চোখের আড়াল করবেন না। একটা সময় ছিল যখন পাড়া-প্রতিবেশীরা একে অন্যের বাচ্চাকে দেখে রাখতেন। সেই সব দিন গল্প হয়ে গেছে। এখন আপনার শিশুর নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারেন দুজন। উপরে আল্লাহ, নিচে আপনি।
২) ওদের কথা শুনুন- গুরুত্ব দিন।
আমরা অনেক সময় বাচ্চা কী বলছে তাতে গুরুত্ব দেই না। এটা খুব বড় ভুল। দয়া করে ও কী বলছে শুনুন।আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সাধু মানুষটি সম্পর্কেও যদি সে কিছু বলে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিন। যাচাই করুন। হয়তো তার কথায় লুকিয়ে আছে বিশাল বিপদের সম্ভাবনা, আপনি টের পাচ্ছেন না।
শিশুর নিরাপত্তাহীনতা শুরু হয় তার কথা অবজ্ঞা করার মধ্য দিয়ে।
শিশুকে একা ছাড়বেন না। কারো সাথেই নয়। মা কিংবা বাবা সাথে যাবেন। একদম না পারলে খুব বিশ্বস্ত কাউকে দিন। বাসায় যারা কাজ করেন তাঁদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু তারপরও বলি বাচ্চাকে ওনাদের সাথে একা ছাড়া যাবে না। একা ড্রাইভারের সাথে স্কুলে পাঠাবেন না।
এই একটি ক্ষেত্রে দুটো শব্দ মাথায় গেঁথে রাখুন- নো অ্যান্ড নেভার,
ওকে অপরিচিত কেউ যদি ডাকে না যেতে বলুন। অপরিচিত কেউ কিছু খেতে দিলে না খেতে বলুন। বাসার ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে না বলতে বলুন। গাড়িতে চরাতে চাইলে শক্তভাবে না করতে বলুন। এক্ষেত্রে পারলে দৌড়ে নিরাপদ জায়গা, যেমন বাড়ি, স্কুল ক্যাম্পাসে ঢুকে যেতে বলুন।
৫ ) সিঁড়ি এবং লিফট: কখনো কখনো ফাঁদ
আমার যখন মেয়ে ছোট তখন আমি তাকে কয়েকটি কাজ কখনোই না করতে বলেছিলাম। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একা সিঁড়িতে না যাওয়া, লিফটে না ওঠা। দুই ক্ষেত্রেই তারা বিপদে পড়তে পারে।
আপনি আপনার বাবুর সেরা বন্ধু হন। ওকে বলুন, সব কথা আপনাকে খুলে বলতে। বলবেন, কোন কিছুতেই আপনি রাগ করবেন না। মা-বাবা রাগ করবেন ভেবে বাচ্চারা অনেক কিছু বলে না।
৭। তার ‘না’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ
শিশুরা অনেক সময় কারো কারো সামনে যেতে চায় না। এতে রাগ না করে তার ‘না’ বলার কারণ বের করুন। সাধারণত এই ‘না’ বিনা কারণে বলা হয় না। এর পেছনের ইতিহাস জানুন।
আপনার শিশুকে একটি পাসওয়ার্ড শেখান। যা বাবা-মা ছাড়া আর কেউ জানবে না। তাকে বলে দিন, যদি কেউ তাকে আপনার নাম করে কোথাও যেতে বলে, বা স্কুল থেকে আনতে যায় তাকে এ পাসওয়ার্ডটি বলার জন্য বলতে। যদি বলতে না পারে, সে যাতে ওই ব্যক্তির সাথে কোথাও না যায়।
কখনো কখনো অনিবার্য কারণে বাচ্চাকে আনার জন্য অন্য কাউকে পাঠাতে হয়। তখন যাকে পাঠাবেন তাকে পাসওয়ার্ডটি বলে দেবেন। পরে তা বদলে ফেলবেন।
৯) ভালো স্পর্শ- খারাপ স্পর্শ
বাচ্চাকে ভালো স্পর্শ এবং খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিন। বলুন, কেউ খারাপ স্পর্শ করলে আপনাকে জানাতে।
১০ ) আত্মরক্ষার কৌশল শেখান
ইদানিং শিশুদের আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্টের কোর্স করানো হয়। পড়ালেখার বাইরে অন্য যে কোনো কিছু শেখানোর আগে তাকে এই কোর্স করান। এটি সারাজীবন নিজেকে নিরাপত্তায় কাজে লাগবে।
উপরের পরামর্শগুলো না দিতে হলে আমার খুব ভালো লাগত। আমাদের শৈশবে এসব বলার দরকার হয়নি, কিন্তু এখন বলা খুব দরকার।
আসাদ চৌধুরীর কবিতার চারটি লাইন শুনুন। নিজেই বুঝবেন-
‘এখন এ-সব স্বপ্নকথা
দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।‘
অল্প মানুষগুলো পূর্ণ মানুষ হোক- শিশুরা নিরাপদে থাকুক- এ প্রার্থনা দিয়ে শেষ করছি।