মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ইসলামাবাদ এমওইউ)’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ কিছুটা থিতু হতে না হতেই নতুন ভূ-রাজনৈতিক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর পর এবার পরমাণু অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে মনোযোগ দিতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সাংবাদিকদের বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের পর এখন উত্তর কোরিয়া ইস্যুর দিকে জোরালোভাবে মনোযোগ দেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে।” এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে লি জে-মিয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট জানান যে, পিয়ংইয়ংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আরোপিত অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞাগুলো বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আর কার্যকর হচ্ছে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের মতে, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা অভূতপূর্ব মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেমলিন বা রাশিয়ার পক্ষ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও কিম জং উন প্রশাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় এক বিশাল বড় সুবিধা এনে দিচ্ছে, যা পুরো কোরিয় উপদ্বীপের জন্য নতুন সামরিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে, তেহরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করে নতুন এক জল্পনার জন্ম দিয়েছেন। ছবিতে ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পকে করমর্দন করতে দেখা যায়। আশ্চর্যজনকভাবে, পোস্ট করা এই ছবিটির সঙ্গে ট্রাম্প কোনো ধরনের ক্যাপশন বা মন্তব্য জুড়ে দেননি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো কথা না লিখেও ট্রাম্প বিশ্ববাসীকে এবং বিশেষ করে পিয়ংইয়ংকে একটি প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরান ইস্যুতে বড় ধরনের অগ্রগতি ও কূটনৈতিক সাফল্য পাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের এশীয় অঞ্চলের নীতিনির্ধারণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প সম্ভবত পুনরায় কিম জং উনের সঙ্গে সরাসরি টেবিল টক বা আলোচনার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে একটি কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার চেষ্টা করবেন।
উল্লেখ্য, ১৯৫০-৫৩ সালের ঐতিহাসিক কোরিয়া যুদ্ধ কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়নি, বরং একটি সাময়িক ‘যুদ্ধবিরতি’ (Armistice Agreement)-এর মাধ্যমে তার অবসান ঘটেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। দুই দেশের মধ্যবর্তী সীমান্ত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও একটি অসামরিকীকৃত অঞ্চল (DMZ) হিসেবে পৃথক রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য কূটনৈতিক নড়চড় এবং পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি নতুন আগ্রহ আগামী দিনে পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কোন মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।