বিশ্বজুড়ে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ক্রাইসিস গ্রুপ, আলজাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান এবং লা মঁদ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ২৮টি দেশে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ, ছড়িয়ে পড়া সংঘাত অথবা তীব্র অভ্যন্তরীণ গোলযোগ চলছে। ভূ-রাজনৈতিক এই দ্বন্দ্বে একদিকে যেমন পরাশক্তিগুলো সরাসরি জড়াচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাতের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্বমানচিত্রের একটি বড় অংশ এখন অবনতিশীল নিরাপত্তা ও চরম মানবিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমানে বিশ্বের সাতটি দেশ সরাসরি যুদ্ধের বিভীষিকা মোকাবিলা করছে, যেখানে তিনটি বড় রণাঙ্গন বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতে এ পর্যন্ত ৫ থেকে ৬ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় ৯৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে, চরম আকার ধারণ করেছে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) থেকে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। চলমান এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই আড়াই হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ঠিক একদিন আগে, ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেও শুরু হয়েছে সরাসরি সীমান্ত সংঘাত। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে এবং শুধু আফগানিস্তানেরই ২০ হাজার পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
সরাসরি যুদ্ধের বাইরেও এই পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক উত্তেজনার আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে আরও ১১টি দেশে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অবনতিশীল। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের রেশ ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননসহ আজারবাইজান ও সাইপ্রাসেও সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। মানচিত্রের প্রবণতা অনুযায়ী, এই অঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং আগামী দিনের জন্য সেখানে গুরুতর সংঘাতের হলুদ রঙের ‘ঝুঁকি সতর্কতা’ জারি করা হয়েছে।
বহিঃশত্রুর আক্রমণ বা আঞ্চলিক যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বের আটটি দেশে বর্তমানে চরম অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলছে। ক্ষমতার পালাবদল, জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সম্পদের বাঁটোয়ারা নিয়ে আফ্রিকার কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নাইজেরিয়া, সুদান, শাদ, ইথিওপিয়া এবং ইরিত্রিয়ায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরে লাতিন আমেরিকার মেক্সিকো এবং মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তানেও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংঘাত চরম রূপ নিয়েছে। এসব দেশের নাগরিকরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা ও জীবনহানির শঙ্কায় দিন পার করছেন।
ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার পাশাপাশি আমেরিকা মহাদেশেও ক্ষমতার পালাবদল ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চরম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবায় বর্তমানে জ্বালানিসহ বহুমুখী সংকট চলছে, যার ফলে দেশটিতে এক সপ্তাহ ধরে টানা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার মতো ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ কিউবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দেওয়ায় দেশটিতে সংঘাতের প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেছে। মূলত ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ছিল এই অভিযানের লক্ষ্য। নেতৃত্বে রদবদল হলেও দেশটিতে এখনও চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে।