• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৮:০৩ অপরাহ্ন
Headline
চীনের সিপিপিসিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক বিদেশি বিনিয়োগের বড় বাধা সরকারি সংস্থাগুলোর ধীরগতি: মির্জা ফখরুল সংরক্ষিত নারী আসন: সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন এনসিপির নুসরাত তাবাসসুম শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: রাজসাক্ষী হতে চান সাবেক ডিআইজি জলিল, জামিন নামঞ্জুর সীমান্তে ‘পুশইন’ ঠেকাতে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ্মা ব্যারেজ: মরুকরণ ও লবণাক্ততার অভিশাপ ঘোচাতে ৩৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের সবুজ সংকেত নড়াইলে বেড়াতে এসে ঘুমন্ত স্ত্রীকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী গ্রেপ্তার নওগাঁয় মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে দুই কৃষকসহ নিহত ৩ মান্দায় পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে ছাগল ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী বিতরণ সত্তরে স্বাস্থ্য রক্ষা— শুরু করতে হয় ত্রিশে: সাতটি পরামর্শ

তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ থেকে ‘খেলা শেষ’

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

যে বাংলায় একদিন ‘খেলা হবে’ স্লোগান তুলে রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়েছিল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই বাংলার ব্যালট বাক্সই চূড়ান্ত রায় দিয়ে বলে দিল—‘খেলা শেষ’। প্রায় দেড় দশক ধরে রাজ্যের মসনদ একচ্ছত্রভাবে আঁকড়ে বসে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এ এক বিরল ও যুগান্তকারী দিন। কারণ, এই রাজ্যে সরকার হয়তো বদলায়, কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক মানসিকতার ভিত এত দ্রুত বদলায় না। কিন্তু এবার তা বদলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঐতিহাসিক পালাবদল কোনো জাদুমন্ত্রে একদিনে আসেনি। অনুন্নয়ন, সরকারবিরোধী তীব্র ক্ষোভ, নিপুণভাবে বোনা ধর্মীয় মেরুকরণ, বিজেপির সুসংগঠিত নির্বাচনী কৌশল এবং প্রশাসনিক ও কাঠামোগত বাস্তবতার এক অদ্ভুত সমবায়ে এই ফলের জন্ম হয়েছে।

এককথায় বলতে গেলে, এবারের ভোটটি কেবল বিজেপির পক্ষে ছিল না, বরং তার চেয়েও বেশি ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। আবেগপ্রবণ বাঙালি এবার শুধু অভিমানই করেনি, ব্যালট বক্সে কড়ায়-গণ্ডায় হিসাবও বুঝিয়ে দিয়েছে।


সীমাদের হিসাববদল ও মেরুকরণের রাজনীতি

নয়াদিল্লিতে কর্মরত এক সাধারণ গৃহকর্মী সীমা দাস। এবারের নির্বাচনে তিনি যেন পুরো পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের এক ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ভোট দেওয়ার জন্য দুই দিনের দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা এবং কয়েকবার ট্রেন বদল করে তিনি নিজের গ্রামে পৌঁছেছেন। এত দিন তিনি ছিলেন তৃণমূলের একনিষ্ঠ ভোটার। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তার সেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্যের রং বদলে গেছে। সংসারের রাজনীতিতে যেমন শাশুড়ির একটি স্বতন্ত্র প্রভাব থাকে, সীমার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। তিনি অকপটে জানালেন, শাশুড়ির প্রভাবেই তার এই অবস্থান বদল। তার ভাষায়, “দিদি মুসলমানদের পক্ষেই বেশি থাকেন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি তাদেরই বেশি তুষ্ট করেন।”

এই অভিযোগটি অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি ঠিক এই কথাটিই বাংলার মাঠে-ঘাটে প্রচার করে এসেছে। তৃণমূল এর জবাবে বারবার বহুত্ববাদ ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার কথা বললেও, ভোটের ফলাফলে সেই ‘তোষণ তত্ত্ব’-এরই এক নিষ্ঠুর ও বাস্তব রূপ দেখা গেল।

এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে যে চিত্রটি ফুটে উঠল, তা তৃণমূলের জন্য রীতিমতো দুঃস্বপ্নের। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০০টির বেশি আসনে জয়ী হয়ে বা এগিয়ে থেকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপির সর্বোচ্চ আসন ছিল মাত্র ৭৭, সেই দলই আজ রাজ্যের প্রধান ও একক শক্তি। বিপরীতে, তৃণমূল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮৭-তে।

কেন ভাঙল দিদির দুর্গ?

এই রাজনৈতিক ভূগোলের এমন আমূল পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে গেলে একটু পেছনে তাকাতে হয়। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসন ভেঙে ২০১১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। তখন তিনি ছিলেন প্রতিবাদের এক জীবন্ত মুখ, রাস্তার ভাষার কারিগর এবং হাওয়াই চটি পায়ে ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদম্য রাজনৈতিক চরিত্র। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মমতা হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন।

মমতার রাজনীতির মূল শক্তি ছিল তার জনসংযোগ। নারী কেন্দ্রিক নানা কল্যাণমূলক কর্মসূচি (যেমন কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার), শিল্পের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান এবং গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাকে এক মজবুত জনসমর্থনের ভিত দিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিতে নেত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর তৃণমূল স্তরে দলীয় সংগঠনের আচরণ সব সময় এক পথে হাঁটে না।

চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাহুল ভার্মার মতে, মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা হয়তো এখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু তৃণমূলের নিচুতলার নেতাদের কার্যকলাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাহাড়প্রমাণ অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে, পাড়ার ক্লাবে বা ব্যবসার ক্ষেত্রে শাসক দলের নেতাদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মানুষ আর ভালোভাবে নেয়নি। আর ঠিক এই জায়গাতেই বিজেপি তাদের মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। বিজেপি এবার তৃণমূলের সেই শূন্যস্থানে নিজেদের সুসংগঠিত প্রচারণাকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বাংলায় বিজেপি একসময় ‘বহিরাগত দল’ বলে বিদ্রুপের পাত্র ছিল, কিন্তু আজ সেই দলই বাঙালির ড্রয়িংরুম দখল করেছে।

নীরব ক্ষোভের সরব বিস্ফোরণ

এবারের নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ ভোটার অংশ নিয়েছেন, যা মোট ভোটারের ৯২.৯৩ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি সর্বোচ্চ উপস্থিতির রেকর্ড। ভোটের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বাঙালি এবার বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা বিরক্ত হলে বা ক্ষুব্ধ হলে ঘরে চুপচাপ বসে থাকে না, বরং বুথে গিয়ে কড়া ভাষায় জবাব দেয়।

নয়াদিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডিজ অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ-এর বিশ্লেষক প্রবীণ রায়ের মতে, তৃণমূল ভোটারদের নতুন কোনো স্বপ্ন বা প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। রাজ্যের অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা বুঝতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই পরাজয় কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতা হারানো নয়, বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জাতীয় রাজনীতিতে ‘বিকল্প নেতৃত্ব’ হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা ছিল, তা-ও প্রায় ধূলিসাৎ করে দিল। অন্যদিকে, বিজেপির এই জয় তাদের জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থানকে আরও নিশ্ছিদ্র ও শক্তিশালী করল।

ধর্মীয় মেরুকরণ ও পুরনো জোটে ফাটল

ভোটের অঙ্কে ধর্মীয় মেরুকরণ এবার একটি বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের নীলাঞ্জন সরকারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শহর ও গ্রামের ভোটারদের মানসিকতায় এবার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। বিশেষ করে শহরের পুরুষ ভোটারদের মধ্যে তীব্র মেরুকরণ ছিল লক্ষণীয়। মুসলিম জনসংখ্যার বড় অংশ যেহেতু গ্রামাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, তাই এই ধর্মীয় বিভাজনের প্রভাব সামগ্রিক ফলাফলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন যে, হিন্দু ভোটের একীকরণ বা কনসোলিডেশন হয়েছে। তার আরও দাবি, এবার অনেক মুসলিম ভোটারও তৃণমূলকে ভোট দেননি। এই দাবির শতভাগ স্বাধীন যাচাই হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু ভোটের পরিসংখ্যান অন্তত এটুকু নিশ্চিত করছে যে, তৃণমূলের পুরনো যে মজবুত সামাজিক জোট ছিল, তাতে বড়সড় ফাটল ধরেছে।


ভোটার তালিকা বিতর্ক ও ২৪০০ কোম্পানি বাহিনীর মনস্তত্ত্ব

নির্বাচনের ফলাফলের পেছনে এই রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলোর পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত বিতর্কও বড় ভূমিকা রেখেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিশেষ সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেয়, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ!

কমিশনের যুক্তি অনুযায়ী, এর মধ্যে ৬০ লাখ ভোটার ছিলেন হয় মৃত অথবা অনুপস্থিত। বাকি ৩০ লাখ ভোটার সময়মতো আপিল করতে না পারায় তাদের ভোটাধিকার হারান। তৃণমূল ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর তরফ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয় যে, এই প্রক্রিয়ায় বেছে বেছে মুসলিম ভোটারদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে বিজেপির হয়ে কাজ করেছে। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দৌড়েছিলেন, কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত এই ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে রায় দেয়নি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন। এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকার রেকর্ড পরিমাণ ২,৪০০ কোম্পানি আধা-সামরিক বাহিনী (CAPF) মোতায়েন করে। সরকারের যুক্তি ছিল ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন’ নিশ্চিত করা। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, এই বিশাল বাহিনী দিয়ে আসলে ভোটারদের মনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশ্লেষক রাহুল ভার্মার মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর এই বিশাল উপস্থিতি পরোক্ষভাবে বিজেপির জন্যই এক অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যেসব দোদুল্যমান ভোটার বা সাধারণ মানুষ স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের পেশিশক্তির ভয়ে শঙ্কিত ছিলেন, তারা বুথের বাইরে বুটপরা জওয়ানদের দেখে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সাহস পেয়েছেন। রাজনীতিতে বন্দুক সব সময় যে গুলি চালানোর জন্যই ব্যবহৃত হয় তা নয়, কখনো কখনো তার স্রেফ উপস্থিতিও ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

‘ডাবল ইঞ্জিন’ বনাম যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকারের লড়াই

এই নির্বাচনের গল্প শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ভারতের বৃহত্তর কেন্দ্র-রাজ্য রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ। ভারতের সংবিধানে প্রতিটি রাজ্যের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, বাস্তব রাজনীতি বলে—দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে রাজ্যের উন্নয়নের ফাইলের গতি বাড়ে। বিজেপির ভাষায় এর নাম ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’।

ডাবল ইঞ্জিন তত্ত্বের মূল কথা হলো, কেন্দ্রে এবং রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের অনুমোদন সহজে পাওয়া যায় এবং অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রতা দূর হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এটি একধরনের প্রচ্ছন্ন চাপ। বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলো প্রতিনিয়তই অভিযোগ করে যে, তাদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকা বা গ্রামীণ আবাসনের মতো প্রকল্পের অর্থ আটকে থাকা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে দড়ি টানাটানি চরমে পৌঁছেছিল। রাজনীতির এই কুস্তিতে যখন নেতাদের অহংবোধ বড় হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই সরকার পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গ কি সত্যিই সেই আকাঙ্ক্ষিত ‘বাড়তি সুবিধা’ বা ডাবল ইঞ্জিনের সুফল পাবে? রাজ্যে এখন বিজেপির সরকার, ফলে দিল্লির সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবের অজুহাত আর টিকবে না। আটকে থাকা টাকা ছাড় হওয়া, নতুন শিল্পের জন্য বিনিয়োগের পথ সুগম হওয়া এবং কর্মসংস্থানের চাকা ঘোরার এক বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এখানে একটি ধ্রুব সত্য মনে রাখা প্রয়োজন—উন্নয়ন কোনো শাসকদলের রাজনৈতিক করুণা নয়, এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। রাস্তাঘাট, কর্মসংস্থান, আবাসন বা পানীয় জল কোনো দলের দয়া নয়। কেন্দ্রের রাজনৈতিক রং যা-ই হোক না কেন, প্রতিটি রাজ্য যাতে তার ন্যায্য পাওনা বুঝে পায়, সেটিই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা।


যখন আবেগ হারে, হিসাব জেতে

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ আসলে সংঘাতমুক্ত একটি সুস্থ উন্নয়ন চাইছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে দিল্লি বনাম কলকাতার এই রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে ক্লান্ত। ভোটের এই ফলাফল তাই কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় নয়, এটি মানুষের এক প্রবল ‘প্রশাসনিক ক্লান্তি’র বহিঃপ্রকাশ।

বাঙালি অনেক দিন ধরে তাদের ‘দিদি’কে ভালোবেসেছে, তাকে দুহাত ভরে সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু ভালোবাসারও তো একসময় হিসাব মেলাতে হয়। যখন পকেট হালকা হতে থাকে, বেকারত্বের জ্বালায় তরুণেরা ভিনরাজ্যে পাড়ি দেয় এবং প্রতিশ্রুতির থালায় নতুন কোনো আশার আলো দেখা যায় না, তখন ভোটাররা আর আবেগী কবি থাকেন না, তারা একনিষ্ঠ হিসাবরক্ষক হয়ে যান।

পশ্চিমবঙ্গে তাই ২০২৬ সালে কেবল একটি রাজনৈতিক দুর্গ ভাঙেনি, ভেঙেছে বাঙালির দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক অভ্যাসও। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই পালাবদলে গেরুয়া রং শুধু ইমারতের দেওয়ালেই লাগে, নাকি তা বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের জীর্ণ খাতাতেও কিছু নতুন আশার সংখ্যা লিখতে পারে। কারণ, নির্বাচনে আবেগ ও ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে ভোটে জেতা হয়তো সহজ, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাতের হাঁড়িতে সেই হারানো আস্থা ফেরানো সত্যিই কঠিন।

সূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category