দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই বর্তমানে অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক ও আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মোট ৩৬০টি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির মধ্যে ৭৪টি প্রতিষ্ঠান চরম ব্যবসায়িক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যা শতাংশের হিসেবে মোট তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এক-পঞ্চমাংশ বা প্রায় ২০ শতাংশ। ডিএসইর সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং নিরপেক্ষ নিরীক্ষক সংস্থাসমূহের অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে পাওয়া চূড়ান্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, তীব্র মূলধন ঘাটতি, ঋণের অনিয়ন্ত্রিত বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদে কারখানা বন্ধ থাকার কারণে এসব কোম্পানি মূল ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারিত তথ্য ডিএসইর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
ডিএসইর হালনাগাদ তথ্যাদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ঝুঁকিতে থাকা এই ৭৪টি কোম্পানির সংকট মূলত দুটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথমত, স্বাধীন নিরীক্ষকদের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে ৫৮টি কোম্পানিকে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন টেকনিক্যাল ও আর্থিক জটিলতায় কারখানা বন্ধ বা সার্বিক বাণিজ্যিক উৎপাদন স্থগিত হয়ে আছে মোট ৩৫টি কোম্পানির। এর মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বন্ধ থাকা ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টি কোম্পানিই নিরীক্ষকের খাতায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে লাল তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ, দুটি পৃথক পর্যালোচনার সমীকরণ মেলালে দেখা যায়, ১৯টি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে কারখানা বন্ধ ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে, ৩৯টি কোম্পানি কেবল অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ঝুঁকিতে রয়েছে এবং বাকি ১৬টি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে কারখানা বন্ধ থাকলেও অডিট রিপোর্টে এখন পর্যন্ত আলাদাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়নি।
উৎপাদন বন্ধ থাকা ৩৫টি কোম্পানির খাতভিত্তিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ধসের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে দেশের বস্ত্র, পোশাক ও স্পিনিং খাতে। তবে এ খাতের বাইরে স্টিল, সিরামিক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিরামিক, প্লাস্টিক, প্রকৌশল, কাঁচ এবং চিনি উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোও একে একে বন্ধের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। বন্ধ থাকা নামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি এগ্রো বায়োটেক, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, আরামিট সিমেন্ট, বারাকা পাওয়ার, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম), এস আলম কোল্ড রোলড স্টিল, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং উসমানিয়া গ্লাস শিটের মতো বড় বড় শিল্প গ্রুপ বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানসমূহ।
কারখানা বন্ধের কারণ ও সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু কোম্পানি গত দুই দশক ধরে বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসেও নতুন করে একাধিক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদন স্থগিত হয়ে আছে ২০০২ সাল থেকে, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং বন্ধ ২০১৬ সাল থেকে এবং তুং হাই নিটিং ২০১৯ সালে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাবে ২০২৬ সালের ২৫ জুন অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, ৯ জুলাই এএফসি এগ্রো এবং ১ আগস্ট থেকে এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলসের মতো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। বন্ধ থাকা এই ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫৪.৩ শতাংশ বা ১৯টি কোম্পানি অডিটরদের চোখেই সার্বিক অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে।
অন্যদিকে, অডিট রিপোর্টের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকিতে থাকা ৫৮টি কোম্পানির তালিকায় পুঁজিবাজারে লেনদেন হওয়া শিল্প, ওষুধ, পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি খাতের পাশাপাশি বড় ধাক্কা খেয়েছে ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) ও বীমা খাত। এই তালিকায় অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, বিডি থাই ফুড, বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ন্যাশনাল টি কোম্পানি, পদ্মা ইসলামী লাইফ, পিপলস লিজিং, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাইনপুকুর কিংবা ইউনিয়ন ব্যাংকের মতো নামগুলো যুক্ত রয়েছে। দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ, মূলধন সংকট এবং অনাদায়ী শ্রেণীকৃত ঋণের কারণে মূলত ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা ঝুঁকিতে পড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। ডিএসইর পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিদর্শন এবং অডিট মতামত প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, দীর্ঘ দিন ধরে নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ থাকা এসব কোম্পানির বিষয়ে কঠোর আইনি বা পুনর্গঠনমূলক সিদ্ধান্ত না নিলে বাজারে আস্থার সংকট আরও তীব্র রূপ নিতে পারে।