• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:১৬ অপরাহ্ন
Headline
‘দ্য রিং’ খ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী ডেভেই চেজ আর নেই অতীত সাগরে ডুবসাঁতার- হাতে তিনটি স্বর্ণপদ্ম আধুনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর উন্নয়ন পরিকল্পনা চলছে: সেনাপ্রধান আদালতের সমন উপেক্ষা: সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়ের কারাগারে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছাল ১২৭ বার ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে দেশের ব্যাংক খাত পুশইনে বিএসএফের নতুন কৌশল ও রুট পঞ্চগড়ে সেনানিবাস স্থাপনের দাবি তুললেন সারজিস আলম মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক প্রকল্পে সাড়ে৪শ কোটি টাকার হরিলুট

মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক প্রকল্পে সাড়ে৪শ কোটি টাকার হরিলুট

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণাধীন দেশের একমাত্র ‘গেম চেঞ্জার’ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক (পোর্ট অ্যাক্সেস রোড) প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও বিক্রির নামে ৪৫০ কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব লুটপাটের এক নজিরবিহীন আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। ১২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পে মাত্র ২৭.২ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, যেখানে কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৭৬ কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটের মহাসড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের শত শত কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব সুবিধা কৌশলে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কোনো ধরনের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং বাধ্যতামূলক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়াই ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের একটি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে মহেশখালী উপকূলের দুটি মৌজা থেকে সমুদ্রের বালু উত্তোলনের একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা দেশের প্রচলিত আর্থিক শৃঙ্খলা ও আইনকানুনকে চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল।

জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বার্থের এই চরম অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদন দায়ের করেছেন। রিটে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূল থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের ওই বিতর্কিত অনুমোদন এবং বালুর অন্যায্য মূল্য নির্ধারণের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়েছে। রিট আবেদনটি গ্রহণ করে হাইকোর্ট আগামী ২১ জুন এর ওপর আনুষ্ঠানিক শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে। এই রিটের মাধ্যমে মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাক্সেস রোড প্রকল্পের আড়ালে ধামাচাপা পড়ে থাকা একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্নীতির চিত্র আদালতের মাধ্যমে জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে, যা দেশের সুশীল সমাজ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মতো সংস্থাকে তীব্রভাবে নাড়া দিয়েছে।

অনুসন্ধানী নথিপত্র এবং রিটের বিবরণী থেকে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমুদ্র থেকে উত্তোলিত বালুর সরকারি রয়্যালটি প্রতি ঘনফুট ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও এর আড়ালে রাখা হয়েছে এক বিশাল শুভঙ্করের ফাঁকি। জেলা প্রশাসন সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূতভাবে বালু ড্রেজিং ও উত্তোলনের ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সরকারি কোষাগার থেকে ঠিকাদারকে উল্টো পরিশোধ বা সমন্বয় করার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ড্রেজিংয়ের সেই ভুতুড়ে খরচ সরকারি ভিত্তিমূল্য থেকে কাটাকাটি করার পর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রকৃত রাজস্ব বা রয়্যালটি হিসেবে জমা হবে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। অথচ দেশের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে ড্রেজিং, বালু উত্তোলন ও ভরাট কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে এবং সরকার চুক্তিপত্র অনুযায়ী কাজের চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করে। কিন্তু এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ক্ষেত্রে বালুর মূল রয়্যালটি থেকেই ড্রেজিং খরচ সমন্বয় করে রাষ্ট্রীয় আয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে তলানিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে লাভ করবে ঠিকাদার আর উত্তোলনের বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে হবে রাষ্ট্রকে।

এই জালিয়াতির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এর চরম লঙ্ঘনের মাধ্যমে। আইন অনুযায়ী দেশের যেকোনো সরকারি বালুমহাল থেকে বালু বিক্রির জন্য উন্মুক্ত দরপত্র বা ইজারা প্রক্রিয়ার আয়োজন করা বাধ্যতামূলক, যেখানে একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দর দিয়ে রাষ্ট্রকে লাভবান করবে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠান নিজস্ব খরচে বালু উত্তোলনের প্রস্তাবসহ সর্বোচ্চ দর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও জেলা প্রশাসন তাদের আবেদন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই স্রেফ ক্ষমতার অপব্যবহার করে টোকিও-এমআইএল-জেভি নামক প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলন, ভরাট ও প্রকল্প এলাকায় সরাসরি ব্যবহারের একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির দোহাই দিয়ে এই বিশাল আর্থিক অনিয়মকে জায়েজ করার চেষ্টা করলেও টিআইবি একে জনগণের রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকাশ্য ও নজিরবিহীন হরিলুট এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই প্রকল্পের কারণে মহেশখালী উপকূলের সমুদ্র পরিবেশও মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, টোকিও-এমআইএল-জেভি নামের এই সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানটি সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ বালু তোলার আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (EIA) নেওয়ার জন্য কোনো আবেদন পর্যন্ত করেনি। আইন অনুযায়ী সমুদ্রের তলদেশ থেকে ৬ কোটিরও বেশি ঘনফুট বালু ড্রেজিং করার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় উপকূলীয় অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতে কী ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হবে, তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান ও জেলা প্রশাসনের এমন একতরফা অনুমোদন দেশের পরিবেশ আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা আগামী দিনে মহেশখালীর উপকূলবর্তী মৎস্য সম্পদ ও সাধারণ মানুষের যাপনে এক বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, পোর্ট অ্যাক্সেস রোড প্রকল্পে বালুর প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা বর্তমান অনুমোদনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন হাইকোর্টে দাখিল করা আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিকভাবে কৌশলগত কারণে মাত্র ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালুর অনুমোদন নিয়ে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পরবর্তীতে একই ত্রুটিপূর্ণ ও ওপেন টেন্ডারহীন চোরাই পথ ব্যবহার করে আরও কয়েক গুণ বেশি বালু উত্তোলনের নামে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব লোপাটের দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট সাজানো হয়েছে। এই কারণে জনস্বার্থে দায়ের করা এই রিটে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা বাতিলই চাওয়া হয়নি, বরং একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার পেছনে আমলা ও প্রভাবশালীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচারিক তদন্তের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন মামলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মাতারবাড়ীর মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে যখন ড্রেজিং খরচের নামে সরকারের সাড়ে চারশো কোটি টাকার রাজস্ব লুণ্ঠন করা হয়, তখন তা কেবল আর্থিক অনিয়ম থাকে না, তা দেশের সুশাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনের স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলার পুনরুদ্ধার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতেই এই আইনি লড়াই শুরু করা হয়েছে। তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, হাইকোর্ট আগামী ২১ জুনের শুনানিতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এই বিশাল রাষ্ট্রীয় ক্ষতি রুখতে কড়া আইনি নির্দেশনা ও রুল জারি করবেন।

তথ্যসূত্র: সময় টিভি, দৈনিক যুগান্তর ও সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category