গত ১৭ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্য নিয়ে হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে দুই পরাশক্তির নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছিল ইসলামাবাদ। তবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দুই পক্ষের নতুন হামলা ও পাল্টাহামলায় সেই শান্তি চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বসেছে। হঠাৎ করে আমেরিকা ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পর তার জবাবে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এই নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে জরুরি টেলিফোন সংলাপ করেছেন। আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকট সমাধানের তাগিদ দেওয়া হলেও, মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— দুই দেশের মধ্যকার তীব্র অবিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তান আদৌ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারবে কি না।
ইরানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৫ দিনের মাথায় প্রায় সব ধারা ভঙ্গ করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের মতে, আমেরিকান হামলায় তাদের ১০টি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অবকাঠামো ধ্বংসসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের মিসাইল হামলায় প্রতিবেশী কাতারেও নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই সংঘাতের মাঝেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন যে, পাকিস্তান, কাতার ও ওমান এখনো উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করে যাচ্ছে। গত ৮ এপ্রিলের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পর থেকে এ নিয়ে অন্তত তিনবার শান্তি চুক্তি ভঙ্গের ঘটনা ঘটল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উত্তেজনার প্রধান মূলবিন্দু হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা। ইরান যে কোনো মূল্যে এই প্রণালীর ওপর নিজেদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক আবারও নৌ-অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অতীতে চীনের সমর্থণে এবং সুইজারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসলামাবাদ দুই দেশকে এক টেবিলে বসাতে সফল হলেও, এবার তাদের সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। কারণ চুক্তি মানাতে বাধ্য করার মতো কোনো সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক আইনি ক্ষমতা পাকিস্তানের হাতে নেই। তাছাড়া ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত কৌশলগত আলোচনার দায়িত্ব পাকিস্তানের হাত থেকে সরিয়ে ওমানের রাজধানী মাস্কাটের ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এতকিছুর পরও পাকিস্তানের বড় শক্তি হলো ওয়াশিংটন ও তেহরান— উভয় প্রশাসনের সাথেই তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অত্যন্ত শক্তিশালী, যা মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
ইসলামাবাদ ও বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের একাংশ এখনও মনে করছেন যে, কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়নি। যদিও বর্তমানে কূটনীতির বদলে দুই পক্ষের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলছে, তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান— কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে জুন মাসের সেই সমঝোতা চুক্তি পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করেনি। ইরান তাদের পাল্টাহামলাকে চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার বাহানা না বানিয়ে কেবল চুক্তি ভঙ্গের জবাব হিসেবে চিহ্নিত করছে। এতে করে ধারণা করা যাচ্ছে যে, ইসলামাবাদ, কাতার ও ওমানের সমন্বিত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আগামীতে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আবারও এক টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়তো একেবারে অসম্ভব হবে না।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ