• শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৪ পূর্বাহ্ন
Headline
শিক্ষার আড়ালে রমরমা বাণিজ্য: মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বেপরোয়া আন্তর্জাতিক চক্র হাইপারভিজিল্যান্স: আপনার কি এরকম কখনো হয়েছে? তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় সংসদে ১০ স্থায়ী কমিটি গঠন, দায়িত্ব পেলেন যারা আকস্মিক বন্যায় নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আশুগঞ্জে শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত সেই গাড়িটি এখনো সচল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে ২৫ সদস্যের এনসিসিএফ গঠন ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবাধিকারই টেকসই শান্তির সংস্কৃতি গড়ার ভিত্তি : আইরিন খান যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে নিহত ১৮ ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা পুতিনের

শিক্ষার আড়ালে রমরমা বাণিজ্য: মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বেপরোয়া আন্তর্জাতিক চক্র

Reporter Name / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গুণগত মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষা এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচের কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোর আকর্ষণ সবসময়ই তুঙ্গে। কিন্তু শিক্ষার এই মহৎ ও সম্ভাবনাময় খাতটিকে এখন পুরোপুরি জিম্মি করে ফেলেছে একটি ভয়ংকর ও বেপরোয়া আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট। এই অসাধু চক্রের আশীর্বাদ ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভর্তির ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই। খোদ সরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়াতেও অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এই চক্রটি। মূলত এই সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণেই বাংলাদেশে পড়তে আসা ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির পুরো প্রক্রিয়ায় তারা পদে পদে নানা ধরনের জালিয়াতি, প্রতারণা এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের আশ্রয় নিচ্ছে, যা দেশের চিকিৎসা শিক্ষার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
একটি বিশাল ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই ভর্তি বাণিজ্য। দেশীয় বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তি, মেডিকেল কলেজগুলোর অ্যাসোসিয়েশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি অসাধু চক্র, ভারতীয় কিছু চিকিৎসক এবং বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের দালাল চক্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে ৬৭টি মেডিকেল কলেজে সর্বমোট আসন সংখ্যা রয়েছে ৬ হাজার ২৯৩টি। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসন অর্থাৎ ২ হাজার ৭৬৪টি আসন শুধুমাত্র বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে অধ্যয়নের জন্য প্রায় এক হাজার ৭০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এসেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক এই শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাইকেই ওই সিন্ডিকেটের হাত ধরেই এ দেশে প্রবেশ করতে হয়েছে।
সাধারণ কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী যদি দালালদের এড়িয়ে সরাসরি কলেজে ভর্তি হতে চান, তবে সেই পথটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সাশ্রয়ী খরচে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার আশায় ভারত থেকে আসা এক শিক্ষার্থী সম্প্রতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে ঢাকার স্বনামধন্য এনাম মেডিকেল কলেজ এবং ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু উভয় কলেজ কর্তৃপক্ষই তাকে সরাসরি ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নির্দিষ্ট ভারতীয় এজেন্টের নম্বর ধরিয়ে দিয়ে তাদের মাধ্যমে আসার কড়া নির্দেশ দেয়। গোপন পরিচয়ে এনাম মেডিকেল কলেজের সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও একই কথা জানান। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, ভারতের কাশ্মীরে অবস্থানরত ডেডি কনসালটেন্সির মো. নবাব, কলকাতার মান্টু দেব এবং নেপালে কর্মরত ডা. সঞ্জিব ও তিলক পান্ডে হচ্ছেন তাদের নির্ধারিত এজেন্ট, এবং এদের মাধ্যম ছাড়া ভর্তি হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। একইভাবে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ থেকেও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ভারতে এমসিএফ এডুকেশনের শেখ মান্নাফ এবং নেপালে সগীর খান ছাড়া অন্য কারও মাধ্যমে তারা কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করান না।
এই সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হলো কোটি কোটি টাকার অবৈধ কমিশন ও কর ফাঁকির মহোৎসব। দেশের প্রায় প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য এই বিদেশি দালালদের সাথে অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ। কলেজগুলো একেকজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বিনিময়ে এই দালালদের মাথাপিছু ৫ থেকে ৭ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের কমিশন প্রদান করে থাকে। অন্যদিকে, এই দালালরা নিজেদের দেশের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কলেজ নির্ধারিত ফি-এর চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। সাধারণত বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো মানভেদে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার আমেরিকান ডলার পর্যন্ত ফি আদায় করে থাকে। কিন্তু দালালদের এই কমিশন বাণিজ্যের কারণে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চেপে বসে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে কলেজগুলো বাংলাদেশ সরকারের কোনো পূর্বানুমতি গ্রহণ করে না। এই রমরমা ব্যবসার জন্য তাদের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স নেওয়া হয় না এবং এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককেও সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং চরম আর্থিক অনিয়ম প্রশ্রয় পাচ্ছে।
আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি এই চক্রটি নজিরবিহীন একাডেমিক জালিয়াতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য অপরিহার্য ‘ইকুইভেলেন্স সার্টিফিকেট’ বা সমমানের সনদ দালালরাই অবৈধভাবে তৈরি করে দেয়, যার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার রুপি আদায় করা হয়। এর চেয়েও বড় জালিয়াতি ঘটে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। নিজ দেশে অনুষ্ঠিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় নূন্যতম নম্বর পেতে ব্যর্থ হওয়া অযোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্য টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণ নকল নম্বরপত্র তৈরি করে দেয় এই চক্রটি। একটি নকল নম্বরপত্র বানাতে তারা তিন থেকে পাঁচ লাখ রুপি পর্যন্ত চার্জ করে থাকে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত অন্তত এমন ৩০০ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন, যাদের চিকিৎসক হওয়ার নূন্যতম যোগ্যতাই ছিল না। দুর্নীতি দমন কমিশনের অতীত তদন্তেও উঠে এসেছিল যে, শুধু কাশ্মীরের ১৯ জন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে সরকারি মেডিকেল কলেজে পর্যন্ত ভর্তি হতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এমনকি সরকারি মেডিকেলের সার্ক কোটার মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গাতেও এই সিন্ডিকেট তাদের থাবা বসিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী সার্ক কোটায় সরকারি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পান, তাদের নামের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার কথা। কিন্তু একটি অসাধু চক্র ওয়েবসাইট আপলোড হওয়ার আগেই টাকার বিনিময়ে সেই তালিকা ভারতীয় দালালদের হাতে তুলে দেয়। এরপর দালালরা ওই সুযোগপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মিথ্যা দাবি করে যে, তারাই টাকার বিনিময়ে এই ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তারা প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৮ থেকে ২৫ লাখ রুপি পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এছাড়া, যেসব শিক্ষার্থী দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে আসা নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে সময়মতো কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হন, দালাল চক্র মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের সেই ত্রুটিগুলোও জাদুকরিভাবে সমাধান করে দেয়।
পুরো দেশের বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বাজারটি কার্যত কয়েকজন নির্দিষ্ট বিদেশি এজেন্টের হাতে জিম্মি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর মধ্যে শেখ মান্নাফ একাই দেশের সর্বোচ্চ ৪০টি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী সরবরাহের একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া পিস এডুকেশনের শেখ বশির উদ্দিন ২০টির বেশি কলেজে কাজ করছেন। অন্যান্য প্রভাবশালী এজেন্টদের মধ্যে রয়েছেন স্প্রিং লাইফ এডুকেশনের চৈতালী সেনগুপ্তা, স্মাইল এডুকেশনের মিস রিপা, কাশ্মীরের ডা. ফয়সাল, ইসফাক মালিক, শাহনেওয়াজ খান, তাহির বাবা, মানিস জেসওয়াল, রাজমন্ডল, বাশারত এবং এনামুল হক সুমন। নেপালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন সগীর খান, ডা. সঞ্জীব ইয়াদাব ও সঞ্জয় সাহা। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশি কোনো উদ্যোক্তা যদি আইন মেনে এজেন্সি খুলতে চান, তবে বেসরকারি মেডিকেলগুলো তাদের কোনো ধরনের অনুমোদন দেয় না। বাধ্য হয়ে দেশীয় এজেন্টদের ওই ভারতীয় এজেন্টদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হয়। এই দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন নিডস এডুকেশনের সৈয়দ মোফাজ্জল করীম এবং ফ্রেন্ডস এডুকেশনের আনীস, যারা ইতিমধ্যে সরকারি মেডিকেল ভর্তি জালিয়াতি মামলার তালিকাভুক্ত আসামি।
এত বড় একটি আন্তর্জাতিক জালিয়াতির নেটওয়ার্ক প্রকাশ্যে কাজ করে গেলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত রহস্যজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ শাখার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে দাবি করে বলেছেন যে, কলেজগুলো পর্যাপ্ত বিদেশি শিক্ষার্থী না পাওয়ার কারণেই মূলত বিদেশি এজেন্টদের শরণাপন্ন হয় এবং এর মধ্যে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ তাদের হাতে নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তাও জালিয়াতির বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করে বলেছেন যে, যেহেতু কাগজপত্র ভারতীয় দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে আসে, তাই এখানে কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের এই সাফাইয়ের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছেন বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই মেডিকেল খাতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির নামে এমন রমরমা ও অবৈধ বাণিজ্যের কথা সবাই জানে। কলেজগুলোর অডিট কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ার কারণেই তারা দিনের পর দিন নানা কৌশলে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে এই বেপরোয়া সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন করা।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category