• বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন
Headline
দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান রাষ্ট্রপতির শেখ হাসিনা, বেনজীরসহ ৩০ পলাতক আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ মিটারের ডিজিটাল ভোজবাজি: প্রথম রিচার্জেই কেন উধাও হয় আপনার টাকা? ধুলোর আস্তরণে ঢাকা সোয়া শ কোটি টাকার স্বপ্ন: চুয়েটে আইটি ইনকিউবেটরের করুণ পরিণতি অভ্যন্তরীণ সংকটে ধুঁকছে দেশীয় পোশাক খাত: সুপরিকল্পিত প্রণোদনায় বাজার ধরছে প্রতিবেশী ভারত কাশির ওষুধের আড়ালে মাদকের ছায়া: ডেক্সট্রোমেথরফেন নিয়ে দেশে নতুন শঙ্কা মেট্রোরেলের মেগা ধাক্কা: হু হু করে বাড়ছে জাপানি ঋণের সুদ ও প্রকল্প ব্যয় আওয়ামী লীগের মেগা প্রকল্পে কাটছাঁট: কমছে অপচয়, বাঁচবে সরকারি কোষাগার

ধুলোর আস্তরণে ঢাকা সোয়া শ কোটি টাকার স্বপ্ন: চুয়েটে আইটি ইনকিউবেটরের করুণ পরিণতি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে একটি নিবিড় সেতুবন্ধ তৈরি করে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েট ক্যাম্পাসে গড়ে তোলা হয়েছিল দেশের প্রথম আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর। প্রায় সোয়া শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সুবিশাল মেগা প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল আজ থেকে চার বছর আগে। আশা করা হয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি নতুন নীরব বিপ্লবের সূচনা করবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার প্রসারে বিশাল ভূমিকা রাখবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, উদ্বোধনের এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সম্ভাবনাময় এই প্রতিষ্ঠানটিতে আজ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত কোনো কার্যক্রমই আলোর মুখ দেখেনি। দিনের পর দিন অব্যবহৃত থাকতে থাকতে ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার দামি আসবাব ও যন্ত্রপাতি। কোনো দৃশ্যমান কাজ না থাকলেও প্রতি মাসে কেবল রক্ষণাবেক্ষণের পেছনেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গচ্চা যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নে চুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতরে ৪ দশমিক ৭ একর জমির ওপর এই বিশাল অবকাঠামোটি গড়ে তোলা হয়েছে। এর ভেতরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ১০ তলাবিশিষ্ট এক অত্যাধুনিক ইনকিউবেশন ভবন, যার প্রতিটি ফ্লোরের আয়তন প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট। এই ভবনের ঠিক পাশেই নারী ও পুরুষদের আবাসিক সুবিধার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে চারতলাবিশিষ্ট পৃথক দুটি সুবিশাল ডরমিটরি। একেকটি ডরমিটরির আয়তন ২০ হাজার বর্গফুট এবং প্রতিটি ভবনে ৪০টি করে সুসজ্জিত কক্ষ রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ছয়তলাবিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস প্রশিক্ষণ ভবন, যার প্রতিটি ফ্লোর ছয় হাজার বর্গফুট আয়তনের। ভবনের ভেতরে স্টার্টআপ জোন, ইনোভেশন জোন, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিক কোলাবোরেশন জোন, ডেটা সেন্টার, রিসার্চ ল্যাব, আটটি আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, ই-লাইব্রেরি থেকে শুরু করে সাইবার ক্যাফে ও ফুড কোর্টের মতো বিশ্বমানের সব সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দুই হাজার কিলোওয়াটের সাবস্টেশন, ৫০০ কিলোওয়াটের ডিজেল জেনারেটর এবং সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। পুরো ক্যাম্পাসটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত এবং এখানে ৩৬০টি এসি ও দশ জিবিপিএস গতির ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা রয়েছে।
অবকাঠামোগত এত এলাহি আয়োজন থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতার চিত্রটি চরম হতাশাজনক এবং রীতিমতো ভুতুড়ে। ইনকিউবেটরের ভেতরে আটটি ল্যাবে বসানো ২২৫টি অত্যাধুনিক কম্পিউটার দীর্ঘকাল অব্যবহৃত পড়ে থাকতে থাকতে এখন প্রায় অচল হওয়ার পথে। কারণ, এসব মূল্যবান প্রযুক্তিপণ্যের দেখভাল বা রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো টেকনিশিয়ান বা ল্যাব সহকারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহারায় পুরো ভবনে রয়েছেন মাত্র একজন নিরাপত্তাকর্মী। প্রতিদিনের কোনো দাপ্তরিক বা গবেষণামূলক কার্যক্রম না থাকলেও সুবিশাল এই ভবনটির বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট বিল এবং গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাবদ প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় তিন লাখ টাকা। সেই হিসাবে বিগত চার বছরে কোনো ধরনের দৃশ্যমান আউটপুট বা সুফল ছাড়াই শুধু রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ রাষ্ট্রের প্রায় দেড় কোটি টাকা পানিতে গেছে।
নতুন স্টার্টআপ এবং আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য এই ইনকিউবেটরে প্রতি বর্গফুট জায়গার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল নামমাত্র, অর্থাৎ মাত্র ১০ টাকা। এত সস্তা ও আকর্ষণীয় ভাড়ার প্রস্তাব থাকার পরও এখানে উদ্যোক্তাদের কোনো ভিড় বা আগ্রহ নেই। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে মোট চারটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় হাজার ৩৭৯ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ‘রকওন আইটি গ্লোবাল’ এবং ‘চালডাল লিমিটেড’ নামের দুটি কোম্পানি শুরুতে কিছু দিনের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে বর্তমানে সেখানে তাদের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। রকওন আইটির স্বত্বাধিকারী ইঞ্জিনিয়ার সুভ্রকার দেব তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, তারা জায়গা বরাদ্দ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত অসুবিধার কারণে সেখান থেকে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে বাধ্য হয়েই তারা সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ইনকিউবেটরের মূল ফটক হয়তো খোলা থাকে, কিন্তু ভেতরের বেশিরভাগ আলিশান কক্ষগুলোই শক্ত করে তালাবদ্ধ। দামি সোফা, কনফারেন্স টেবিল আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে কেবলই নীরবতা আর ধুলোময়লার রাজত্ব।
একটি যুগান্তকারী স্বপ্নের প্রকল্প কেন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল, তার কারণ খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও দ্বৈত ব্যবস্থাপনার এক চরম ব্যর্থতার গল্প। ২০১৭ সালের ৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বা একনেক সভায় যখন এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮২ কোটি ২ লাখ টাকা। পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর ২০২২ সালের ৬ জুলাই উদ্বোধনের সময় চূড়ান্ত ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২৫ কোটি টাকায়। চুক্তি ও নিয়ম অনুযায়ী, নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর পুরো প্রকল্পটির একক কর্তৃত্ব চুয়েট কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এখনো সেই কর্তৃত্ব হস্তান্তর করেনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির যেকোনো নীতিগত ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, আর চুয়েট কেবল দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য জনবল সরবরাহ করে থাকে। আর এই জনবলের বেতন-ভাতাও আসে হাই-টেক পার্কের ফান্ড থেকে। কাজের এই সমন্বয়ের অভাবেই পুরো ব্যবস্থাপনা এখন স্থবির হয়ে আছে।
এই অচলবস্থার বিষয়ে চুয়েটের উপাচার্য প্রফেসর ডক্টর আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই প্রতিষ্ঠান চালানোর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বেতন-ভাতাসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে রয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, এই দ্বৈত নীতির অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যদি এককভাবে পুরোপুরি চুয়েটের আওতাধীনে দিয়ে দেওয়া হয়, তবেই এখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সফলতা বা সর্বোচ্চ সুবিধা বের করে আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপসহকারী পরিচালক শেখ মেহেদী হাসান জানিয়েছেন যে, ইনকিউবেটরকে কীভাবে সফলভাবে কাজে লাগানো যায়, তার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে সম্প্রতি একটি পারফরম্যান্স অডিট দল চুয়েটে গিয়েছিল। ওই বিশেষ দলটি প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত, বর্তমান বেহাল অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবে এবং সেই প্রতিবেদনের আলোকেই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। দেশের প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব ঘটানোর যে অপার সম্ভাবনা নিয়ে এই ইনকিউবেটরের জন্ম হয়েছিল, কেবল প্রশাসনিক টানাপোড়েনে তা আজ মৃতপ্রায়। দ্রুত একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই স্থবিরতা না কাটালে এটি কেবলই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের একটি করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category