দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজারে সস্তা শ্রম ও মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সবচেয়ে আস্থার জায়গা ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই চিরচেনা চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। দেশের ভেতরের বহুমুখী ও কাঠামোগত সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা এখন ধীরে ধীরে বিকল্প বাজারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। বিশেষ করে শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র হাহাকার, ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী উৎপাদন ব্যয়, চট্টগ্রাম বন্দরের লজিস্টিক ধীরগতি এবং পণ্য উৎপাদন শেষে সরবরাহ করতে দীর্ঘ সময় বা লিড টাইম লাগার কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন কার্যাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবেশী দেশ ভারতে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের এই আকস্মিক বিকল্প খোঁজার প্রবণতা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি ভয়ংকর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পোশাকশিল্পের মালিক ও খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু সস্তা দামে পণ্য তৈরি করতে পারাই শেষ কথা নয়, বরং ঠিক সময়ে ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছে দেওয়াটা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে একই সঙ্গে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ঠিক এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ভারত সরকার তাদের শক্তিশালী অবকাঠামো, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিজেদের বাজার আরও মজবুত করছে।
আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারের গতিপ্রকৃতি এখন অনেক বেশি সময়নির্ভর হয়ে পড়েছে। শিল্পমালিকেরা জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এই ‘লিড টাইম’ বা পণ্য সরবরাহের সময়সীমা। দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন দুনিয়ায় একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের পোশাক বাজারে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ দেরি হওয়ার অর্থ হলো ওই নির্দিষ্ট ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পুরো বিপণন পরিকল্পনা ও বিক্রি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এ কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন এমন দেশের দিকেই বেশি ঝুঁকছে, যেখান থেকে কার্যাদেশ দেওয়ার পর অত্যন্ত দ্রুত পণ্য তৈরি করে জাহাজে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে কোনো একটি কার্যাদেশের পণ্য সম্পূর্ণ তৈরি করে জাহাজে তুলতে গড়ে ৬০ থেকে ৯৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অন্যদিকে ঠিক একই কাজ করতে ভারতে সময় লাগে মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ দিন। প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের মধ্যে ভিয়েতনামে লাগে ৬০ দিন এবং চীনে লাগে মাত্র ৩২ দিন। পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে সময়ের এই বিশাল ব্যবধানই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে ভারতসহ অন্যান্য বিকল্প দেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিল্পমালিকেরা আরও বলছেন, শুধু শিপমেন্ট বা জাহাজীকরণে দীর্ঘসূত্রতাই একমাত্র কারণ নয়, ক্রেতার বেঁধে দেওয়া সময় অনুযায়ী কারখানার ভেতরে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তৈরি পোশাক উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে দেশের চলমান জ্বালানিসংকট। বিশেষ করে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলোতে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় দৈনন্দিন উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের স্বার্থে অনেক কারখানামালিক বাধ্য হয়ে অনেক বেশি দামে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছেন, যা তাদের উৎপাদন খরচ অবিশ্বাস্য হারে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কারখানা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনের ভাড়াও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির বা বিজিএমইএর দেওয়া তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে শিল্প খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রায় ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে ২০২৪ সালে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় মালিকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের বা বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সব সময়ই ঝুঁকি এড়াতে চান এবং যেকোনো দেশে কার্যাদেশ দেওয়ার আগে এই ঝুঁকিপূর্ণ সূচকগুলো খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তনের সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে যে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার কারণে কিছু কার্যাদেশ অন্যান্য দেশে চলে গেছে এবং এর একটি অংশ ভারতেও গেছে। তবে তিনি মনে করেন না যে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, বরং জ্বালানিসংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিই এখন শিল্পমালিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা।
এদিকে পোশাক খাতের এই নাজুক অবস্থা তুলে ধরতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তারা রাষ্ট্রপতিকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেছেন যে, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণে গত তিন বছরে দেশে প্রায় চার শ পোশাক কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। এই একই সময়ে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে খাতটিকে রক্ষার জন্য তারা সরকারের কাছে জ্বালানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান, উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের পদক্ষেপ জোরদার করার জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের এই সাময়িক দুর্বলতার সুযোগটি ভারত অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পোশাকশিল্পের বিকাশে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করে আসছে। উন্নত অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং ইউরোপের বাজারকে লক্ষ্য করে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত সরকার তাদের ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’ বা পিএলআই কর্মসূচির আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল ও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে হাজার হাজার কোটি রুপির বিশাল প্রণোদনা দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ভারত সরকার ‘পিএম মিত্র’ প্রকল্পের মাধ্যমে সুতা, কাপড়, রং, পোশাক তৈরি এবং লজিস্টিক সুবিধাকে একই মেগা শিল্পাঞ্চলের ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে, যা তাদের উৎপাদন সময় ও খরচ জাদুকরিভাবে কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তুলা উৎপাদক দেশ হওয়ায় ভারতের নিজস্ব কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাও অত্যন্ত শক্তিশালী। এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাদের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও আলোচনা বেশ জোরেশোরে অব্যাহত রয়েছে। এসব চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ভারতীয় পোশাক বিশ্ববাজারে আরও বেশি শুল্কসুবিধা পাবে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যা উৎপাদন সক্ষমতায় নয়, বরং সমস্যা হলো উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, স্থিতিশীলতা এবং সময়সীমা ধরে রাখার ব্যর্থতায়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার স্বীকৃতি আজও বাংলাদেশের ঝুলিতেই রয়েছে এবং এ দেশের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ডক্টর জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা যদি জ্বালানিসংকটের কারণে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তাই সরকারকে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নীতি পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেনও স্বীকার করেছেন যে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নির্দিষ্ট লিড টাইমে পণ্য পাওয়া নিয়ে কিছু বিদেশি ক্রেতার মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে কি না, তা নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, এলডিসি উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ করার বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়িত হলে বাজার হারানো ঠেকানো সম্ভব হবে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত বন্দর সেবা, লিড টাইম কমিয়ে আনা এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আজ যে কার্যাদেশগুলো ভারতের দিকে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আরও ভয়ংকর ও অপূরণীয় ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা