রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো একসময় দেশের মানুষের কাছে সোনালি স্বপ্ন হিসেবে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই স্বপ্ন এখন অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক কঠিন ও রূঢ় কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান) প্রকল্প দুটির সংশোধিত প্রস্তাবনা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে। প্রকল্প দুটির ব্যয় যেমন অবিশ্বাস্য হারে বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, ঠিক তেমনি এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে নেওয়া জাপানি ঋণের সুদের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) যখন এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু বর্তমানে দেশের প্রথম এই পাতালরেল প্রকল্পের ব্যয় ১২৯ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। অন্যদিকে ২০১৯ সালে অনুমোদিত এমআরটি লাইন-৫ নর্দান (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা থেকে ১২৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যয়ের এই আকাশচুম্বী উল্লম্ফন প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
জাইকার ঋণে সুদের উল্লম্ফন: শূন্য দশমিক ৬ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশের শঙ্কা
প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির এই ভয়াবহ চিত্রের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নকারী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি। গত ৩০ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যবিবরণী থেকে এই উদ্বেগজনক তথ্যটি উঠে এসেছে। হিসাব বলছে, এই দুটি মেগা প্রকল্পের জন্য জাইকার অর্থায়নের ওপর সুদের হার প্রাথমিক রেয়াতি হার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে লাফিয়ে সাড়ে ৩ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ যখন জাপানের সঙ্গে ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার প্রাথমিক ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন সুদের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু বাকি বিশাল অঙ্কের ঋণের জন্য তখন কোনো সুনির্দিষ্ট শর্ত বা সুদের হার চূড়ান্ত করা হয়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যমতে, এমআরটি লাইন-১ এর জন্য জাপানি অর্থায়নের পরিমাণ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। বর্ধিত এই বিশাল পুঁজি এখনকার বৈশ্বিক বাজারদর অনুযায়ী সংগ্রহ করতে হবে, যার সুদের হার এরই মধ্যে ৩ দশমিক ০৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং আগামী অক্টোবরে তা সাড়ে ৩ শতাংশ স্পর্শ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেহেতু জাপান বছরে দুবার তাদের ঋণের সুদের হার পর্যালোচনা করে, তাই আগামী এপ্রিলে সুদের হার নতুন করে নির্ধারণের সময় এই হার আরও বেড়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা রয়েছে।
এমআরটি-৫ এর আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের পাহাড়সম আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত ২৯ হাজার ১১৯ কোটি টাকা জাপানি অর্থায়নের মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা শূন্য দশমিক ৬ শতাংশের কম সুদে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জাপান নীতিগতভাবে আরও ৩৯ হাজার ৮১৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত অর্থায়নে সম্মত হলেও, ঋণের এই নতুন কিস্তির জন্য বাংলাদেশকে অনেক বেশি হারে সুদ গুনতে হবে। ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, জাইকা অতিরিক্ত অর্থায়নে রাজি হলেও ফিক্সড, ফ্লোটিং বা পরিবর্তনশীল সুদের মতো ঋণের কাঠামো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সুদের হার যে ভবিষ্যতে কমে আসবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে, বরং ফিক্সড রেট বা নির্দিষ্ট সুদের হারে চুক্তি করে ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমানোর পথটিও এখন বেশ কঠিন। ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, জাইকার ঋণের সুদের হার ২০২২ সালেও ১ শতাংশের নিচে ছিল। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০২৬ সালে তা ৩ শতাংশের ঘর অতিক্রম করে। বৈশ্বিক সুদের হার, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণদাতার নিজস্ব নীতি এবং প্রকল্প চূড়ান্ত করার সময়কার ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করেই জাইকা ঋণের শর্তগুলো মূল্যায়ন করে থাকে। গত জুনেও ৩১৪ মিলিয়ন ডলারের একটি জাপানি ঋণের সুদের হার ছিল ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সক্ষমতা ও বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
মেগা প্রকল্পের এমন লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধি এবং চড়া সুদের জোড়া ধাক্কা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য কতটা টেকসই, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, ৩ দশমিক ০৫ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ সুদের হার আগের তুলনায় অনেক বেশি হলেও, আন্তর্জাতিক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাজারের প্রেক্ষাপটে এটি এখনো তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বর্তমানে ৫ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। কিন্তু আসল শঙ্কার জায়গাটি হলো প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বা কমার্শিয়াল ভায়াবিলিটি। যেহেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে, তাই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত সুফলও যদি একই হারে না বাড়ে, তবে স্বাভাবিকভাবেই এর বেনিফিট-কস্ট রেশিও বা সুবিধা-ব্যয়ের অনুপাত মারাত্মকভাবে কমে যাবে। ব্যয় যখন আড়াই গুণ হয়ে যায়, তখন ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন বা অভ্যন্তরীণ আয়ের হার আদৌ টেকসই পর্যায়ে থাকবে কি না, তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ রয়েছে। এর চেয়েও বড় শঙ্কার জায়গা হলো সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা। বর্ধিত ব্যয়ের কারণে সরকারকে এখন নিজস্ব তহবিল থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের জোগান দিতে হবে। রাজস্ব আদায়ের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি, সরকারের বিদ্যমান ব্যয়ের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই বিশাল অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সামলানো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য এক অসাধ্য সাধন হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণের উন্মাদনায় মেতে না থেকে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সক্ষমতা ও রিটার্নের সঠিক মূল্যায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।