• বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন
Headline
সমাজ বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্তক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান রাষ্ট্রপতির শেখ হাসিনা, বেনজীরসহ ৩০ পলাতক আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস আজ মিটারের ডিজিটাল ভোজবাজি: প্রথম রিচার্জেই কেন উধাও হয় আপনার টাকা? ধুলোর আস্তরণে ঢাকা সোয়া শ কোটি টাকার স্বপ্ন: চুয়েটে আইটি ইনকিউবেটরের করুণ পরিণতি অভ্যন্তরীণ সংকটে ধুঁকছে দেশীয় পোশাক খাত: সুপরিকল্পিত প্রণোদনায় বাজার ধরছে প্রতিবেশী ভারত কাশির ওষুধের আড়ালে মাদকের ছায়া: ডেক্সট্রোমেথরফেন নিয়ে দেশে নতুন শঙ্কা মেট্রোরেলের মেগা ধাক্কা: হু হু করে বাড়ছে জাপানি ঋণের সুদ ও প্রকল্প ব্যয়

কাশির ওষুধের আড়ালে মাদকের ছায়া: ডেক্সট্রোমেথরফেন নিয়ে দেশে নতুন শঙ্কা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্দি বা কাশির উপশমে যে ওষুধটি আমরা নিশ্চিন্তে সেবন করছি, তার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে মাদকের উপাদান। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় আটটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তৈরি ১৪টি কাশির সিরাপে ‘ডেক্সট্রোমেথরফেন’ নামক একটি উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। বাংলাদেশের বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী এই উপাদানটি প্রথম তফসিলের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত একটি নিয়ন্ত্রিত মাদক। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করতে এবং আমদানি সীমিত করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে ডিএনসি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিকিৎসকের কোনো ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অবাধে এই সিরাপগুলো কেনা যাচ্ছে এবং বিক্রেতাদের ধারণা, অনেকেই চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াও কেবল নেশা করার উদ্দেশ্যে এগুলো কিনে নিচ্ছেন।
এই পুরো বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে গত ১৩ মার্চ বগুড়া সদর থানায় দায়ের হওয়া একটি মাদকসংক্রান্ত মামলার সূত্র ধরে। ওই মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা সিরাপগুলো পরীক্ষার জন্য ডিএনসির রাজশাহী বিভাগীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। সেখানে ১৪টি কাশির সিরাপের নমুনা পরীক্ষা করে সব কটিতেই ডেক্সট্রোমেথরফেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। গত ১৬ মার্চ রাজশাহী পরীক্ষাগারের পরীক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সরকার ডিএনসির মহাপরিচালককে লেখা এক চিঠিতে জানান যে, বেক্সিমকো, স্কয়ার, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, অপসোনিন ফার্মা, এসিআই, একমি ল্যাবরেটরিজ, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস এবং অ্যারিস্টোফার্মার মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কাশির সিরাপে এই উপাদানটি পাওয়া গেছে। তবে সাধারণ মানুষ যাতে এই সিরাপগুলোর অপব্যবহারে উৎসাহিত না হয়, সে জন্য সংবাদমাধ্যমে এগুলোর নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নেম প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা হয়েছে।
দেশে সীমান্তপথে ফেনসিডিলের মতো প্রচলিত মাদকের চোরাচালান কমে যাওয়ার পর মাদকাসক্তরা নেশার নতুন বিকল্প হিসেবে এই ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত কাশির সিরাপ বেছে নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে দেওয়া চিঠিতে ডিএনসি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে এই সিরাপগুলো কাশির নিরাময়ে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে যুবসমাজ ও মাদকাসক্তরা এটি সেবন করছে। এই সিরাপ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হাইপোম্যানিয়া বা তীব্র সাইকোসিস, শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক মাথা ঘোরা, অস্থিরতা, খিঁচুনি এবং জিহ্বা বা গলায় ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। এমনকি মাত্রাতিরিক্ত সেবনের ফলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, এটি মরফিনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সিনথেটিক ওষুধ, যা বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘদিন অপব্যবহারের ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য মানসিক কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রিটানিকা আরও বলছে, মরফিন-সংশ্লিষ্ট উপাদানের মতো এটি সাধারণত আসক্তি তৈরি না করলেও বিনোদনমূলক মাদক হিসেবে এর অপব্যবহার করা হয়।
এই ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে গত ২৯ জুন ডিএনসির প্রধান কার্যালয় থেকে ঔষধ প্ৰশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ডেক্সট্রোমেথরফেন সহযোগে প্রস্তুত করা ওষুধের আমদানি ও বিক্রি সীমিত করার পাশাপাশি প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে। ডিএনসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, আগে কোন প্রতিষ্ঠান এই উপাদান ব্যবহার করছে তার সুস্পষ্ট তথ্য তাদের কাছে ছিল না, তবে এখন খোঁজ নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহীর পরীক্ষক শফিকুল ইসলাম সরকার জানান, এর আগেও তিনবার রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকের এই উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়ার পর চিঠি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আমলে নেওয়া হয়নি। ডিএনসির অপর এক কর্মকর্তার দাবি, ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন। তবে বর্তমান প্রশাসন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের বহু দেশে ডেক্সট্রোমেথরফেন অবৈধ কোনো উপাদান নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে এটি দিয়ে তৈরি ওষুধ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বিক্রি হয়। তবে ফ্রান্স, রাশিয়া, সুইডেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কিছু দেশে এটি প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের এটি কেনার ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত মনে করেন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এটিকে ‘ক’ শ্রেণির মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত না করলেও হতো, কারণ সাধারণত হেরোইন বা কোকেনের মতো মাদক এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে অপব্যবহার রোধে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ ধরনের সিরাপ বিক্রি অবশ্যই নিষিদ্ধ করা উচিত বলে তিনি মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ডেক্সট্রোমেথরফেন কাশির ওষুধে ব্যবহৃত একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত উপাদান। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৫৩ সাল থেকেই এটি কাশির সিরাপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিকন ফার্মা, এসকেএফ, অপসোনিন এবং এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মকর্তারাও একই সুরে জানিয়েছেন যে, তারা সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এবং নির্ধারিত মাত্রা মেনেই এই ওষুধ তৈরি করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় সেবন করলে এটি কোনো সমস্যা তৈরি করে না। তবে সরকার যদি এই উপাদানের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে, তবে তারা বিকল্প উপায়ে সিরাপ তৈরির ব্যবস্থা নেবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, ওষুধের কার্যকারিতা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে তাদের নিজস্ব নিয়মনীতি রয়েছে। যেহেতু ডিএনসি চিঠি দিয়েছে, তাই বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং প্রাথমিকভাবে ডেক্সট্রোমেথরফেনযুক্ত ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না করার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category