বছরখানেক আগে এক অপরিচিত যুবক আমার সাথে দেখা করতে এলো। নাম ফয়সাল। খুব স্মার্ট, ধোপদুরস্ত।
আমি চোখে প্রশ্ন নিয়ে তার দিকে তাকালাম। সে বলল-‘ ভাই, আমি খুব দুঃসাহসী একটি কাজ করতে চাইছি, তাই আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি।‘
আমি অবাক হয়ে বললাম- ‘কী পরামর্শ?’
‘আপনার বন্ধু অপু আমাকে বলেছে আপনার সাথে আলাপ করতে।’
‘আচ্ছা। অপু অবশ্য আমাকে কিছু বলেনি, যাই হোক, বলুন কী ব্যাপারে পরামর্শ চান?’
‘আমি DHL Express ও DHL Global Forwarding -কাজ করতাম। সে সূত্রে আমি এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজ করেছি। এরপর Nitex নামে একটি কোম্পানির গ্লোবাল এইচ আর ডিরেক্টর ছিলাম। সেই সূত্রেও আমি বিভিন্ন দেশে কাজ করেছি। খুব ভালো বেতন ও ফ্যাসিলিটি পাই। কোম্পানি আমার কাজে খুব খুশি- কিন্তু আমি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাই।’
আমি অবাক হয়ে বললাম- ‘কেন?’
‘আমি একটি নিজেই একটি ব্যাবসা দাঁড় করাতে চাই।‘
একটু ধাক্কা খেলাম। তা সামলে নিয়ে বললাম-
‘এত ভালো চাকরি ছেড়ে মসলার ব্যাবসা করবেন? বাজারে তো শত শত মসলা আছে। সব বড় গ্রুপ অব কোম্পানিজ এ ব্যাবসায় নেমেছে। বেশি রিস্কি হয়ে যাচ্ছে না?’
ফয়সাল হেসে বলল- ‘ আমি জানি খুব ঝঁকিপূর্ণ। বাজারে অনেক মসলা আছে। কিন্তু আমি মনে হয় পারব, কারণ আমার বিজনেস মডেল হবে ভিন্ন।‘
‘আমার টার্গেট গ্রুপ হবে ভেজাল নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ মধ্যবিত্ত।
বাজারে প্রচলিত মশলার ভেজাল নিয়ে তাঁরা সবাই চিন্তিত। আমার মশলার মূল ব্যতিক্রম হবে এখানে। আমি ভেজালমুক্ত স্বাস্থ্যকর মশলা নিশ্চিত করব।’
‘করতে পারলে তো ভালোই।’ আমার শংকা দূর হয়নি।
ফয়সাল আমার নিরাসক্তিতে দমলো না। বলল -‘ তাছাড়া, সবাই মশলার লাইফ দীর্ঘ করার জন্য প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করে, আমি তা করব না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, মশলার প্যাকেটে রান্নার রেসিপি থাকবে। যিনি মাংস রান্না করবেন তিনি মাংসের রেসিপি পাবেন। যিনি মাছ রান্না করবেন, তিনি মাছের রেসিপি পাবেন। তাঁকে আর তেমন কিছু অ্যাড করতে হবে না। আমাদের রেসিপি ফলো করেই রান্না শেষ করতে পারবেন। এভাবে আমি রান্নাটা সুস্বাদু কিন্তু সহজ করে ফেলব।’
আমি বললাম- ‘এতেই আপনি মার্কেট পাবেন?’
‘আরো ব্যাপার আছে। বাচ্চারা মাছ খেতে চায় না। আমি তাদের জন্য সুস্বাদু করে মাছ রান্নার আলাদা রেসিপি আনব। ওরা পছন্দ করবে- আই গ্যারান্টি।’
এই আইডিয়া আমার পছন্দ হলো। বললাম-‘এতক্ষণ যা বললেন তার মধ্যে এই ব্যাপারটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। কিন্তু পারবেন মার্কেটে টিকে থাকতে।‘
‘আমার ধারণা পারব। কারণ মধ্যবিত্তরা নিরাপদ মসলা খুঁজছেন। এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি জিনিস। অথচ তাতে ভেজাল নামের বিষ মেশানো হচ্ছে। তা থেকে মুক্তির পথ পেলে তাঁরা লুফে নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।‘
‘এটা নিয়ে আমি অনেক কাজ করেছি। তারপর আবিষ্কার করেছি, বাজারে প্রচলিত মসলার চাইতে সামান্য বেশি দাম রাখলে তা ভেজালমুক্ত রাখা সম্ভব।’
‘আপনি তো সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন- তাহলে আমার কাছে পরামর্শের জন্য কেন এসেছেন?’
‘আমার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে কিনা জানতে।‘
আমি সংশয় নিয়ে বললাম- ‘আমি সারাজীবন চাকরি করেছি। চাকরিজীবিরা ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। তাই আমি আপনাকে পরামর্শ দিতে পারব না। আপনি বরং নিজের মনের কথা শুনুন এবং সিদ্ধান্ত নিন।‘
কোনো পরামর্শ না পেয়ে ফয়সাল হতাশা নিয়ে বিদায় নিলো। যাওয়ার সময় বলল- ‘আমার মন বলছে আমি পারব। কারণ ব্যবসার আইডিয়াটিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। তাই মশলার নাম লিখেছি পরম। ‘পরম ভালোবাসা’ থেকে পরম।‘
আমি মৃদু হেসে বললাম- ‘মাইন্ড ইয়োর স্টেপ। বুঝেশুনে পা দিন।’
গত ডিসেম্বরে ফয়সাল পাঁচ লাখ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে দিল। চালু করল ‘পরম’ (Porom) নামের মশলা। তার কোনো শো রুম নেই,ছোট্ট একটি অফিস থেকে সে অনলাইনে তা বিক্রি করা শুরু করল।
পাঁচ মাস পর দেখছি ফয়সাল তার ছোট্ট টিম নিয়ে বিজয়ের ঘুড়ি উড়াচ্ছে। যদিও তার মার্কেট খুব বড় হয়নি- কিন্তু যেভাবে এগুচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ভালো করবে।
কমফোর্ট জোনের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ফয়সাল যে সাহস দেখিয়েছে তার জন্য আমি তাকে স্যালুট জানাই। কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, এত বড় ঝুঁকি নেওয়া কি ওর উচিত হয়েছে?
পাদটিকা: আমি মাঝে মাঝে ভিন্নধর্মী উদ্যোক্তাদের নিয়ে লিখি। কিন্তু তাদের পণ্য প্রমোট করি না। তাই ‘পরম’ মসলার মান কেমন বা তা কোথায় পাওয়া যায় তা বললাম না।