রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকায় শনিবার রেললাইনের আশপাশের বস্তিসদৃশ এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। দিনের আলোতে স্বয়ং সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে এমন ঝটিকা অভিযান পরিচালনার ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসী, সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন এবং নানামুখী আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ওই অভিযানের সময় প্রতিমন্ত্রী কেবল নিজেই অস্ত্র হাতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেননি, বরং তার সঙ্গে থাকা সহযোগীরা আশপাশের নীল ও সবুজ ত্রিপল দিয়ে ঘেরা বিভিন্ন অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর তাৎক্ষণিকভাবে গুঁড়িয়ে দেন এবং সেখান থেকে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকে পাকড়াও করেন। পরবর্তীতে সেখানে আটককৃত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ১০ জনকে মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শনিবার সকালে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ, ঘিঞ্জি ও সুবিধাবঞ্চিত একটি এলাকায় এই আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিবরণ এবং পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ডান হাতে একটি কালো রঙের পিস্তল উঁচিয়ে ধরে রেললাইনের পাশের সরু গলিপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় তিনি বেশ কঠোর ও আগ্রাসী ভঙ্গিতে আশপাশের সাধারণ লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন মৌখিক নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত চারপাশ ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছেন। ভিডিওতে তার সঙ্গে থাকা বেশ কয়েকজন যুবক ও অনুসারীকে অত্যন্ত তৎপর দেখা যায়, যারা বিভিন্ন ঝুপড়ি ঘরে ঢুকে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন, সন্দেহভাজনদের পাকড়াও করছিলেন এবং ঘরগুলোর অস্থায়ী ছাউনি টেনেহিঁচড়ে উপড়ে ফেলে ধ্বংস করছিলেন।
অভিযান পরিচালনার কিছুক্ষণ পরই পুরো ঘটনাটি স্বয়ং প্রতিমন্ত্রী নিজেই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করার মাধ্যমে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা ওই ভিডিওটির ক্যাপশনে তিনি অত্যন্ত জোরালো ও আক্রমণাত্মক ভাষায় উল্লেখ করেন, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদকের আখড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, কারবারিদের সোপর্দ করা হলো পুলিশের হাতে’। ওই ভিডিও ক্লিপটিতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে পুরো অভিযানটির সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ও অবৈধ অস্থায়ী স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার পুরো সময়জুড়েই তার হাতে উন্মুক্ত আগ্নেয়াস্ত্রটি দৃশ্যমান ছিল। সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী পর্যায়ের পদে অধিষ্ঠিত থেকে এভাবে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে নামার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বিরল হওয়ায় তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা এমনকি সরকারের কোনো উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির এভাবে নিজস্ব উদ্যোগে কোনো এলাকায় সরাসরি অভিযান পরিচালনা এবং নাগরিকদের আটক করার আইনি বৈধতা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী গণমাধ্যমের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় দেশের আইনি সীমানা ব্যাখ্যা করে জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি, সমন্বয় ও নেতৃত্ব ছাড়া কোনো সাধারণ ব্যক্তি বা একক কোনো ব্যক্তি নিজস্ব উদ্যোগে কোনো ধরনের অভিযান চালাতে পারেন না। তবে দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যদি কেউ কোনো অপরাধীকে অপরাধ সংঘটনের সময় হাতেনাতে আটক করেন, তবে তাকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার সংবিধানে ও আইনে রয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী আরও জানান, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি যে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় ব্যক্তিগতভাবে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং ঘটনাস্থলে মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে কিছু ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটক করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি গেণ্ডারিয়া থানা পুলিশকে অবগত করা হলে পুলিশের একটি দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায় এবং আটককৃত ব্যক্তিদের নিজেদের হেফাজতে নেয়। এরপর পুলিশ সেখানে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদের পর ১০ জনকে গেণ্ডারিয়া থানায় নিয়ে আসে। তাদের অতীত অপরাধের রেকর্ড যাচাই করে এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তবে সেই ভূমিকা অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকেই বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে কোনো অভিযানে স্বয়ং জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া কতটা সমীচীন এবং তা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দেয়, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। যদি কোনো জনপ্রতিনিধি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সও থাকে, তবুও আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো বেসামরিক সমাবেশ কিংবা জনবহুল এলাকায় সেই অস্ত্র প্রকাশ্যে উঁচিয়ে ধরা বা প্রদর্শন করা অস্ত্র আইনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া ও এর আশপাশের রেললাইন সংলগ্ন অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধ জগতের বিভিন্ন চক্র ও মাদক কেনাবেচার নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা জানান, এই রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ঝুপড়ি, চা-পানের দোকান এবং ভাঙাড়ির দোকানগুলোর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা, হেরোইন এবং মরণনেশা ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্যের রমরমা কারবার চলছিল। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের গোপন ছত্রছায়ায় এসব অপরাধচক্র পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে বা কোনো প্রতিবাদ করতে পারত না। প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক ও কঠোর ঝটিকা অভিযানের ফলে এলাকার অনেক সাধারণ বাসিন্দা স্বস্তি প্রকাশ করলেও প্রকাশ্য অস্ত্রের ব্যবহার ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে তাদের মধ্যেও কিছুটা আতঙ্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
অভিযানের সময় ধারণ করা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, নীল ও সবুজ রঙের পলিথিন ও ত্রিপল টানিয়ে রেললাইনের ঢালে যেসব অস্থায়ী মাদক সেবনের গোপন আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছিল, প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই তার অনুসারীরা লাঠিসোঁটা দিয়ে বাঁশের খুঁটি উপড়ে ফেলে সেগুলো ধসিয়ে দিচ্ছেন। এ সময় আশপাশের কৌতূহলী শত শত মানুষ জড়ো হলে প্রতিমন্ত্রী তাদের উদ্দেশ্যে মাদকবিরোধী কঠোর বক্তব্য দেন এবং এই অঞ্চলকে চিরতরে মাদকমুক্ত করার জোরালো প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে বলেন যে কোনো মাদক কারবারি বা সন্ত্রাসীকে এই এলাকায় আর এক মুহূর্তের জন্যও ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে পুরো ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে এবং প্রকাশ্যে পিস্তল বহনের কারণ ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীদের ফোনকল কিংবা ক্ষুদে বার্তার তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি তার দপ্তরের ব্যক্তিগত সহকারী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এই মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে প্রকাশ্যে পিস্তল প্রদর্শনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কোনো ব্যাখ্যা বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সার্বিকভাবে এই নজিরবিহীন ঘটনাটি রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। একদিকে যখন মাদকের বিস্তার রোধে সমাজের সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের সোচ্চার ভূমিকা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, অন্যদিকে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব কোনো ব্যক্তির নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। আগামী দিনগুলোতে গেণ্ডারিয়া থানা পুলিশ আটককৃতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের মামলা দায়ের করে এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ধরনের অভিযানের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসে কি না, সেদিকেই এখন সবার নজর রয়েছে।
তথ্যসূত্র: নিউএজ