• শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

দল পুনর্গঠনে ক্লিন ইমেজ খুঁজছে বিএনপি

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

অঙ্গসংগঠনে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির খোঁজে হাইকমান্ড: পদত্যাগের বার্তায় থমকে আছে চার সংগঠনের কার্যক্রম, কাউন্সিলেও বিলম্বের সুর

দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দলের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত চারটি প্রধান অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন—জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। তবে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের এই সন্ধিক্ষণে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত আটকে রয়েছে। এর প্রধান কারণ, যুবদলের সাধারণ সম্পাদকসহ স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের শীর্ষ নেতারা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় টিকিট পেয়ে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব আনা অবধারিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বকেও ডেকে নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। এমন নির্দেশনার পর সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।

এদিকে সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় রাড্ডা ট্রাস্টের ঘটনায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি একযোগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে দ্রুত নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই ছাড়া চূড়ান্ত কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। মূলত প্রতিটি স্তরেই বিতর্কহীন, স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন এবং ক্লিন ইমেজের নেতা খুঁজে বের করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই কমিটি পুনর্গঠনে এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখলদারি, চাঁদাবাজি ও দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই দলের হাইকমান্ড কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হাইকমান্ড এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, কোনো দাগি, বিতর্কিত কিংবা জনরোষের কারণ হতে পারেন এমন কাউকেই নেতৃত্বে বসানো হবে না। নতুন কমিটিগুলোতে মেধাবী, তরুণ, শিক্ষিত এবং সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে এমন নেতাদের পাশাপাশি বিগত দিনের দুঃসময়ে রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রভাগে থাকা ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সংগঠনের গতিশীলতা ফেরানোর চেয়েও দলের সুনাম ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখাই এখন হাইকমান্ডের প্রধান অগ্রাধিকার, যার কারণে প্রতিটি প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্বের পাশাপাশি বিএনপির মূল দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বহুল প্রতীক্ষিত এই জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রাথমিক কথা ছিল। দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিক প্রকাশ্য বক্তব্যে ডিসেম্বরে কাউন্সিল আয়োজনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ডিসেম্বরে এই কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সব প্রস্তুতি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে আগামী বছরের জানুয়ারি নাগাদ এই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি।

সম্প্রতি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে বিস্তারিত কোনো আলোচনা হয়নি। বৈঠকে মূলত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা সীমিত হলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, আসন্ন এই কাউন্সিল দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, দীর্ঘদিনের শূন্য পদ পূরণ এবং ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবার কেন্দ্র থেকে পছন্দের নেতাদের চাপিয়ে দেওয়ার দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সরাসরি মতামত ও সমর্থনের ভিত্তিতে প্রকৃত নেতৃত্ব নির্বাচন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। জাতীয় কাউন্সিলের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, কাউন্সিলের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন এবং খুব দ্রুতই এ সংক্রান্ত ঘোষণা আসবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চ রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সেই সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন করেছিলেন। দলীয় গঠনতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজনের কথা থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা-হামলা, কারাবরণ এবং সার্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ আট বছর দলটি কোনো জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ এই বিরতির পর হতে যাওয়া সপ্তম কাউন্সিলকে ঘিরে দলের প্রতিটি স্তরেই এক নতুন প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল এবং ছাত্রদলের সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশী নেতাদের দৌড়ঝাঁপ এখন তুঙ্গে। নতুন কমিটিতে স্থান পেতে আগ্রহী নেতারা প্রতিদিন কেন্দ্রীয় নেতাদের কার্যালয়, বাসভবন এবং রাজনৈতিক আড্ডায় নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। বিগত দিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের সক্রিয় ভূমিকা, জেল-জুলুম ও ত্যাগের খতিয়ান তুলে ধরছেন দায়িত্বশীলদের সামনে। তবে নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, কেবল পদ পাওয়ার জন্য তোষামোদ কিংবা লবিং কাজে আসবে না। বিগত দিনের রাজপথের সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যই নেতৃত্ব নির্বাচনের মূল মাপকাঠি হবে। বিশেষ করে যারা বিগত সময়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ন্যূনতম জড়িত ছিলেন, তাদের নাম সরাসরি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় যুবদলের দপ্তর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তাদের হাতে পৌঁছায়নি। তবে সম্প্রতি ভেঙে দেওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের নতুন নেতৃত্ব চূড়ান্ত করতে যাচাই-বাছাই ও তথ্যানুসন্ধানের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। অন্যদিকে ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি এবং রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুই শীর্ষ নেতাই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সংগঠনের শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়টি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই বিষয়ে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে দলের চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তিনিই যথাসময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

কৃষক দলের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি ও শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের শীর্ষ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তারাও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করায় নতুন নেতৃত্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে তৃণমূলের অন্যতম প্রাণশক্তি ছাত্রদলে গত ২০২৪ সালের ১লা মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী গত ১লা মার্চ এই কমিটির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির জানিয়েছেন, সরকারপ্রধান ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখনই সাংগঠনিকভাবে উপযুক্ত মনে করবেন, তখনই নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করবেন। তারা আশা করছেন, শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করার জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

তথ্যসূত্র: মানব জমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category