ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো চুক্তি ছাড়াই ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের ফিরে আসা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই ব্যর্থতা ট্রাম্প প্রশাসনকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে হয় দীর্ঘমেয়াদী সংলাপে যেতে হবে, না হয় ফিরতে হবে এক বিধ্বংসী যুদ্ধে।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জেডি ভ্যান্স ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার জন্য একটি কঠোর প্রস্তাব দেন। ভ্যান্সের ভাষায় এটি ছিল ‘মেনে নাও নয়তো বিদায় হও’ (Take it or leave it) ধরনের প্রস্তাব। তিনি সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা স্পষ্ট করে দিয়েছিল, কিন্তু ইরান সেই শর্ত মানতে রাজি হয়নি। মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার এবং মজুত ত্যাগ করার প্রশ্নেই দুই পক্ষ অনড় অবস্থানে ছিল।
গত ফেব্রুয়ারিতে জেনেভা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে ৩৮ দিনব্যাপী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পেন্টাগনের মতে, ওই অভিযানে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছিল। ট্রাম্পের ধারণা ছিল, এই বিধ্বংসী সামরিক শক্তি দেখে ইরান নমনীয় হবে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র তাদের নতি স্বীকার করাতে পারবে না। উল্টো এই হামলা তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করেছে।
এই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরির অস্ত্র হিসেবে এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে ইরান তাদের পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের সাথে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছে। বিশ্ববাজারের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই পথ দিয়েই হয়, ফলে এটি বন্ধ থাকা মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস।
২১ এপ্রিল বর্তমানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ হতে যাচ্ছে। এখন হোয়াইট হাউসের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করবেন। তবে তাঁর সামনে পথগুলো বেশ কঠিন:
পুনরায় যুদ্ধ: নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং ৩.৩ শতাংশে থাকা মার্কিন মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদী সংলাপ: ওবামা আমলের মতো দীর্ঘ সংলাপে বসা ট্রাম্পের কৌশলের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ তিনি শুরু থেকেই ইরানকে কেবল ‘আত্মসমর্পণ’ করতে বলছেন।
জেডি ভ্যান্সের এই ব্যর্থ সফর একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—উভয় পক্ষই নিজেকে বিজয়ী মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা বিপুল বোমা ফেলে ইরানকে দুর্বল করেছে, আর ইরান মনে করছে তারা ধ্বংস না হয়ে টিকে থেকেই জয়ী হয়েছে। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই কোনো পক্ষকেই আপোসের টেবিলে বসতে দিচ্ছে না।