আন্তর্জাতিক সীমারেখা পুনর্নির্ধারণের জটিল রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে। সীমান্ত নিরাপত্তার অজুহাতে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে ভূমি অদলবদলের প্রক্রিয়া শুরু হতেই এর তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। প্রায় ১,৬৪৩ কিলোমিটার বিস্তৃত দীর্ঘ ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ভারতের চার রাজ্য—অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মণিপুরের মধ্যে প্রধান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে মণিপুরের চান্দেল জেলা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই সীমান্ত অঞ্চলের ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী প্রায় আড়াই কিলোমিটার (১.৪ বর্গমাইল) ভূখণ্ড অমিমাংসিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যার স্পষ্ট সীমানা দুটি দেশের কোনোটির জাতীয় নথিপত্রেই সুনির্দিষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত পর্যালোচনার কথা স্বীকার করতেই স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজ রাজপথে নেমে এসে রাজ্যটির এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও হাতছাড়া না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সীমান্ত সংক্রান্ত এই পুরনো বিরোধ হঠাৎ করে তীব্র রূপ নেওয়ার পেছনে কাজ করছে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মণিপুরের চলমান জাতিগত সংঘাত। ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ ও সামরিক জান্তা সরকারের কোণঠাসা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওই অঞ্চলের অনিয়ন্ত্রিত উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে দেদারসে অবৈধ অস্ত্র, বিষাক্ত মাদক এবং বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ভারতে অনুপ্রবেশ করছে। এই অবৈধ পারাপার বন্ধ করে ভারতের নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সমগ্র মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমেছে। কিন্তু সীমানা সুনির্দিষ্ট করা না গেলে বেড়া নির্মাণের কাজ চালানো অসম্ভব হওয়ায় ভারত সরকার মিয়ানমারের কাবাও উপত্যকা সংলগ্ন বিতর্কিত জমিটুকুর বিষয়ে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। মূলত উন্মুক্ত এই পেছনের দরজাটি দ্রুত স্থায়ীভাবে বন্ধ করতেই কৌশলগত ভূমি বিনিময়ের দিকে ঝুঁকছে দিল্লি।
তবে দিল্লির শীতল দাপ্তরিক কামরায় বসে গ্রহণ করা এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের সাথে বাস্তবের জনআবেগের বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়েছে। মণিপুরের সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় অধিকাররক্ষা সংগঠনগুলো এই প্রস্তাবিত ‘ল্যান্ড সোয়াপ’ বা ভূমি বিনিময়ের সিদ্ধান্তকে রাজ্যস্বার্থের চরম পরিপন্থী ও বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। সীমান্ত রেখার আড়ালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসা আদিবাসী পরিবারগুলোর ভিটেমাটি, নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার ও চাষাবাদের জমি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বা কূটনীতির কারণে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সেখানে তুমুল জনবিক্ষোভ দানা বাঁধছে। ইতোমধ্যেই জাতিগত সহিংসতায় জর্জরিত মণিপুরে কোনো ধরনের স্থানীয় পরামর্শ ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে তা ওই অঞ্চলের জ্বলন্ত পরিস্থিতিতে আগুনে কেরোসিন ঢালার শামিল হবে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সীমান্ত সুরক্ষিত করা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ এবং অতীতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অত্যন্ত সফলভাবে ছিটমহল ও ভূখণ্ড বিনিময় সম্পন্ন করার ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ নেপিডোর বর্তমান দুর্বল সামরিক জান্তা সরকার নিজ দেশে বিদ্রোহীদের সাথে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে একটি ভঙ্গুর ও অস্থির সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক সীমান্ত চুক্তি সম্পাদন করাটা কতটুকু কার্যকর বা টেকসই হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উপরন্তু, নিজের নাগরিকদের আবেগকে উপেক্ষা করে কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে সীমান্ত রেখা পরিবর্তনের উদ্যোগ ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন করে বড় ধরনের হুমকি ডেকে আনতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত সামগ্রিক বিষয়টি এখনো প্রাথমিক আলোচনা ও পর্যালোচনার স্তরে রয়েছে এবং নীতিগত চুক্তি চূড়ান্ত হতে বহু ধাপ বাকি রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান পেতে হলে কেবল সীমান্ত বন্ধ করার প্রশাসনিক তাড়াহুড়ো করলেই চলবে না; বরং সীমান্ত এলাকার মূল স্টেকহোল্ডার বা ভূখণ্ডের আদি অধিবাসীদের সাথে গঠনমূলক আলোচনায় বসতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের আবেগের মধ্যে সুচিন্তিত ভারসাম্য বজায় রেখে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক মানচিত্রের এই সামান্য কাটাকুটি অঞ্চলটির ভবিষ্যৎকে চিরতরে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।