• শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৬ অপরাহ্ন
Headline
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সরকারের নানা কর্মসূচি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকোটকে সমর্থন আরব জোটের, কোণঠাসা নেতানিয়াহু ৩০ বিলিয়নের নিচে রিজার্ভ, তবু মেটানো যাবে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় গডফাদার ১ হাজারের বেশি: কোটি মাদক জব্দের পরও বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে ৮৫ শতাংশ ৩ বছর পরপর হালনাগাদ হবে সরকারি নির্মাণের দর, ৬ মাসে ডিজিটাল ব্যবস্থা ৩ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্সেও কাটছে না চাপ ঝুলে আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার আবেদন: এনআইডি সংশোধনের নামে সক্রিয় ভয়ংকর চক্র বিপ্লব ও সংহতি দিবস : জিয়া জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারী রাজধানীর ৫৭ ওয়ার্ডের ১৪ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা: ডেঙ্গু ঝুঁকিতে ২৯টি ঘুড়ির নাটাই আপনার হাতে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলীয় বিপর্যয়: কংগ্রেসে নিরঙ্কুশ আধিপত্য হারিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়

Reporter Name / ১১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির শোচনীয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে আগে থেকেই যে তীব্র জনঅসন্তোষ ও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, চূড়ান্ত ভোটের ফলাফলে সেটিই অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উভয় কক্ষ অর্থাৎ আইন প্রণয়নের উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে হাতছাড়া হয়েছে ট্রাম্প শিবিরের। রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়কর পরাজয় প্রমাণ করেছে যে গত দুই বছর ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের রায় প্রকাশ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে মূলত বর্তমান রাষ্ট্রপতির প্রথম দুই বছরের শাসনকাল ও কার্যক্রমের ওপর জনগণের প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের এই নির্বাচনী লড়াইয়ে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিল লাগাতার মূল্যস্ফীতি, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য শুল্কের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ। বিভিন্ন জরিপকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে জনজীবনের এই চরম সংকটগুলো ভোটের বাক্সে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। অধিকাংশ বিশ্লেষক ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার কথা বললেও চূড়ান্ত ফলাফল সেই সমস্ত পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঝড়ের সৃষ্টি করেছে।

প্রতিনিধি পরিষদের মোট চারশত পঁয়ত্রিশটি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যেখানে জাদুর সংখ্যা বা ম্যাজিক ফিগার ছিল দুইশত আঠারোটি, সেখানে ডেমোক্র্যাট দল নির্ধারিত এই লক্ষ্য বহু আগেই পার করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক ফলাফল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা দুইশত পঁচিশটিরও বেশি আসন নিশ্চিত করেছে, যেখানে রিপাবলিকান পার্টির ঝুলিতে এসেছে মাত্র একশত আটত্রিশটি আসন। ঠিক একইভাবে সিনেটের একশত আসনের লড়াইয়েও ডেমোক্র্যাটরা তাদের আধিপত্য বজায় রেখে মোট চুয়ান্নটি আসন নিজেদের দখলে নিয়েছে। নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের যে শক্ত অবস্থান ছিল, ডেমোক্র্যাটদের এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ের ফলে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ঘটনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অবশিষ্ট সময়কালকে অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। নতুন বছরের জানুয়ারি মাসে যখন বিজয়ী আইনপ্রণেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবেন, তখন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের তদন্ত শুরু করার আইনি সুযোগ পাবেন। শুধু তাই নয়, সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়মিত বাধার সৃষ্টি করা সম্ভব হবে, যা হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে অনেকাংশেই পঙ্গু করে দিতে পারে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশিষ্ট গবেষক লরেল র‍্যাপ আল-জাজিরার সঙ্গে আলাপকালে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনটি মার্কিন জনগণের পক্ষ থেকে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের জোরালো বার্তা। আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্পকে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চরম আইনগত ও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হবে। তবে মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সামরিক জোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যেকোনো স্থানে সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী রয়েছে, যা তিনি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারবেন।

রিপাবলিকানদের এই চরম ব্যর্থতার পেছনে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে এবং বর্তমান দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে চলা নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও জনঅসন্তোষ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। রয়টার্স ও ইপসসের সাম্প্রতিক একটি যৌথ জরিপে দেখা গিয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নেমে এসেছিল মাত্র একচল্লিশ শতাংশে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সর্বনিম্ন রেকর্ড। বিশেষ করে ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরান সংঘাত দ্রুত শেষ না হওয়ায় এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠায় মার্কিন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসে, যা ভোটারদের ক্ষোভকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতা ও নীতিকে অপব্যবহার করে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ ও ব্যবসা বাড়ানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। সাধারণ মানুষের এই অর্থনৈতিক কষ্ট এবং আস্থার সংকটকে বিরোধীরা অত্যন্ত সুচারুভাবে তাদের প্রচারণায় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচনের ঠিক আগে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের সরাসরি এবং একতরফা হস্তক্ষেপের কারণে দলীয় শিবিরের ভেতর থেকেই তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ব্যালট বাক্সে। টেক্সাস ও সাউথ ক্যালিফোর্নিয়ার মতো রিপাবলিকানদের পুরোনো ও শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন।

দেশজুড়ে এই নির্বাচনে কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনই ঘটেনি, বরং প্রায় অর্ধশত অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পঞ্চাশটি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে এখন ছাব্বিশটিরও বেশি গভর্নরের পদ ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ দখলে চলে গেছে। এবারের এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ব্যানারে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বিজয় অর্জিত হয়েছে, যা মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মিশিগান থেকে প্রথম মুসলিম আমেরিকান সিনেটর হিসেবে আব্দুল আল-সাইদ জয়লাভ করেছেন, যা ট্রাম্পের বর্ণবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে এক কঠোর জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্যে নিউ মেক্সিকো থেকে ডেব হালান্ড প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হিসেবে এবং পেগি ফ্ল্যানাগান প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে কেইশা ল্যান্স প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন এবং টেক্সাস থেকে জিনা হিনোজোসা প্রথম লাতিন নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাট শিবির জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ বইছে এবং প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য স্পিকার হাকিম জেফ্রিস ঘোষণা করেছেন যে মার্কিন জনগণ কট্টরপন্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন।

নির্বাচনের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ফলাফল যখন ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে যাওয়া শুরু করে, তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ কঠোর আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে নরম সুর গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি ডেমোক্র্যাটদের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানান এবং দেশের সার্বিক কল্যাণে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও এই নির্বাচনের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে, যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে জানানো হয়েছে যে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের শত্রুতার নীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয় কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক জয় নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তির এক তীব্র আকুলতা। এখন দেখার বিষয় হলো, কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ডেমোক্র্যাটরা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিমা সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শুল্কনীতির সংস্কার করা এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ভূমিকা রাখতে পারে। মার্কিন অর্থনীতির এই সংকুল পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ নীতিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে দেশটির রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category