• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ন

হরমুজ প্রণালিতে টোল বসাল ইরান: জাহাজপ্রতি কত ফি গুনতে হচ্ছে?

Reporter Name / ৮৩ Time View
Update : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কড়া জবাব হিসেবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরোধ করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞরা আসন্ন এক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বিশ্বে সরবরাহ করা মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। সংঘাত শুরুর আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকলেও, ইরানে আগ্রাসনের পর থেকে এটি এখন বৈশ্বিক আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

আটকে আছে ২ হাজার জাহাজ, টোল আদায়ের আইনি উদ্যোগ বর্তমানে এই সংকীর্ণ প্রণালির দুই পাশে প্রায় ২ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ ও অয়েল ট্যাংকার আটকা পড়ে আছে। গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, দেশটির পার্লামেন্ট এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বিদেশি জাহাজগুলো থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে টোল আদায়ের জন্য একটি আইন পাসের উদ্যোগ নিচ্ছে।

ইরানের তাসনিম ও ফার্স সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে জানানো হয়, এ সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইন বিভাগ এটি চূড়ান্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ইরানের এক পদস্থ কর্মকর্তা যুক্তি দিয়ে বলেন, “এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে যাতায়াতকারী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইরানকে ফি বা শুল্ক আদায় করতে হবে। এটি সম্পূর্ণ একটি স্বাভাবিক বিষয়। অন্যান্য আন্তর্জাতিক করিডরে পণ্য পরিবহনের সময় যেমন শুল্ক দিতে হয়, হরমুজ প্রণালিও তেমনই একটি করিডর। যেহেতু আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, তাই জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোর আমাদের শুল্ক দেওয়াটাই স্বাভাবিক।”

ঘোষণাহীন টোল বুথ ও অর্থনৈতিক প্রভাব তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই, গত দুই সপ্তাহে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালিতে অঘোষিতভাবে একটি টোল বুথ ব্যবস্থা চালু করেছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল নজরদারি প্রতিষ্ঠান ‘লয়েডস লিস্ট’।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা শুরু করে, এরপর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও এলএনজি বহনকারী ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় আইআরজিসি। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা যুদ্ধপূর্ব অবস্থার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং এবং বাধ্য হয়ে শিল্প উৎপাদন কমানোর মতো চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ তেল ও গ্যাস রপ্তানির একমাত্র পথ হওয়ায়, বিভিন্ন দেশ এখন জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেতে ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এর জবাবে ইরান যুদ্ধ অবসানের জন্য যে পাঁচটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে, তার অন্যতম হলো—হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান।

গত রোববার ইরানের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, কিছু বড় জাহাজের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “যুদ্ধের একটি বড় খরচ আছে, তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেই আমাদের এই ফি নিতে হচ্ছে।”

অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা ও টোল আদায়ের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে প্রায় ২ হাজার জাহাজ প্রণালির দুই পাশে পারাপারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। মেরিটাইম গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড-এর মতে, বিকল্প দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহারের বদলে বেশির ভাগ জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে হলেও অপেক্ষাই শ্রেয় মনে করছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহে মাত্র ১৬টি জাহাজকে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) চালু রেখে প্রণালি পার হতে দেখা গেছে। এছাড়া একই সময়ে মাত্র চারটি কার্গো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

আইন চূড়ান্ত না হলেও, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ২৬টি জাহাজ আইআরজিসির পূর্বানুমোদন নিয়ে তাদের নির্দেশিত রুটে চলাচল করেছে। এর একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে: ১. জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। ২. জাহাজের সম্পূর্ণ তথ্য (নথি, আইএমও নম্বর, মালামালের বিবরণ, ক্রুদের নাম ও গন্তব্য) জমা দিতে হয়। ৩. আইআরজিসির নৌবাহিনী সব তথ্য যাচাই করে সন্তুষ্ট হলে একটি বিশেষ ‘কোড’ প্রদান করে এবং যাতায়াতের নির্দিষ্ট রুট বলে দেয়। ৪. প্রণালিতে প্রবেশের পর রেডিওর মাধ্যমে সেই কোড পুনরায় যাচাই করা হয়। ৫. সব ঠিক থাকলে ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় জাহাজটিকে প্রণালি পার করে দেওয়া হয়। পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকেই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

কারা টোল দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন? ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাদে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জাহাজ নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে প্রণালি পার হতে পারবে। ইতোমধ্যে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, মিসর ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। জানা গেছে, কিছু দেশ মার্কিন ডলার এড়িয়ে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ এই ফি পরিশোধ করেছে; তবে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, তারা কোনো ধরনের ফি বা টোল প্রদান করেনি।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রণালিগুলোতে সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অবাধ অধিকার রয়েছে এবং তা কোনো অজুহাতেই স্থগিত করা যায় না। তবে ইরান পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে যে, তারা এই সমুদ্র আইনে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুস্বাক্ষর করেনি, তাই তারা এটি মানতে বাধ্য নয়। সমুদ্র বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিটি এতটাই সংকীর্ণ যে, এর অনেক স্থানে ইরান ও ওমানের জলসীমা একে অপরের সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তীব্র বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আল-জাবের ইরানের এই পদক্ষেপকে সরাসরি ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি হুশিয়ার করে বলেন, “ইরান যখন হরমুজ প্রণালিকে এভাবে জিম্মি করে, তখন তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশের অর্থনীতির ওপর—জ্বালানি, খাদ্য থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম পর্যন্ত বেড়ে যায়।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাও একমত যে, হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা সামাল দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category