• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

১০ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের যা বলা উচিত নয়

বাদল সৈয়দ / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

১৯৭৫- ৭৬ সাল।
আমার বয়স তখন সাত- আট। আব্বা একদিন হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তাঁকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। সেদিনই প্রথম আবিষ্কৃত হলো, আব্বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
তখন উচ্চ রক্তচাপকে গুরুতর সমস্যা ভাবা হতো। তাই আব্বা এ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন অনেককেই দেখলাম খুব চিন্তিত। তাঁরা কেউ কেউ আমার সামনে বলতেন- ‘ আহা! ওদের বাবা এত অসুস্থ! কিছু হলে বাচ্চাগুলো যাবে কোথায়?’
আমি তখন ‘কিছু হলে’ কথাটার অর্থ কিছুটা বুঝতাম। তাই যতবার এ কথা শুনতাম ততবার আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত। আমি ভয়ে নীল হয়ে যেতাম।
ভাবতাম আব্বার কিছু হলে আমাদের কী হবে?
নিজে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আমার এ ট্রমা কাটেনি।
উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ার পর আব্বা আরো ত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন। আমি চাকরিতে ঢোকার বারো বছর পর তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু ছোটোবেলায় তাঁর অসুস্থতার কথা বারবার বলায় আমার মধ্যে যে ট্রমা সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের কিছু কথা একদম বলা উচিত নয়। কারণ তারা এগুলো একদম নিতে পারে না। তাদের ভেতরে ধ্বস নামে। পরে দেখলাম, বিভিন্ন বইপত্র এবং অনলাইন কনটেন্টও একই কথা বলছে।
নিচে এ রকম সাতটি কথা তুলে ধরলাম- যা তাদের বলা উচিত নয় বা তাদের সাথে শেয়ার করা উচিত নয়।
১ ) তাদের নিজেদের আর্থিক সমস্যার কথা বলবেন না। এ সমস্যা সমাধানে তারা কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। যা তাদের ভেঙেচুরে শেষ করে দেবে।
২ ) নিজেদের দাম্পত্য সমস্যা নিয়ে তাদের কিছুই বলা যাবে না। তারা ব্যাপারটি বুঝবে না- কিন্তু বুঝতে পারবে বাসায় মেঘ জমেছে। ফলে ভয় পাবে- অনিশ্চয়তায় ভুগবে।
৩ ) পরিবারের অন্য সদস্যদের বদনাম করবেন না। এতে তার মধ্যে পরিবারের প্রতি কোনো বন্ধন গড়ে উঠবে না। মনে রাখবেন, পারিবারিক বন্ধন সারাজীবন তাকে আগলে রাখবে। এটি নষ্ট করে তার বিপদের ভরসা বিলীন করবেন না। মনে রাখবেন, অন্যের বিচার করার বয়স তার হয়নি।
৪ ) আপনার শৈশবের খারাপ অভিজ্ঞতা তাকে বলবেন না। যদি বলেন, পৃথিবী সম্পর্কে তার অবিশ্বাস তৈরি হবে। কাউকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করবে না। অথচ এ দুটো ছাড়া সে বেশি দূর যেতে পারবে না। ( তবে সাবধান করার জন্য উপযুক্ত সময়ে এ ধরনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন )
৫ ) বাবা-মা পরস্পরের বিরুদ্ধে তাকে বলবেন না। এর ফলে সে দুজনের প্রতিই শ্রদ্ধা হারাবে। কাউকেই মানবে না। তাদের প্রতিটি আচরণ তার কাছে ভুল মনে হবে। এ ধরনের আলাপ তার গোড়ায় কুঠার মারার শামিল।
৬ ) তার দুর্বলতা নিয়ে খোঁটা দেবেন না। চেষ্টা করলে এগুলো ঠিক হয়ে যাবে বলে ভরসা দেবেন। খোঁটা দিলে তার আত্মবিশ্বাস গোড়াতেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
৭) আমরা প্রায় এই বয়সের শিশুদের বিভিন্ন বিষয়ে হুমকি দিই। এটি শিশুর মনে খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। তাদের আত্মবিশ্বাসের পানি ঢেলে দেয়। যেটা তারা সহজে কাটাতে পারে না।
এ বয়সে আমি পড়াশোনা করতে চাইতাম না, তখন একজন আমাকে বলতেন- ‘পড়ালেখা না করলে কিন্তু তোকে জেল স্কুলে দিয়ে দেবে।’
কথাটি আমার মধ্যে তীব্র ভয় তৈরি করত। এতে যে পড়াশোনায় ঝুঁকতাম না তা নয়- যেটা করতাম তাহলো, পড়ার সময় হলে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করতাম। ধরা পড়লে যদি জেল স্কুলে দিয়ে দেয়! পরে আব্বা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে সবাইকে এ ধরনের কথা কখনো না বলার আদেশ দিয়েছিলেন।
বাচ্চা হাতিটির গল্প মনে আছে?
হাতির বাচ্চাটিকে শিশুকালে পায়ে শেকল দিয়ে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সেটি যখন পূর্ণ হাতিতে রূপ নেয় তখন প্রচণ্ড শক্তি থাকা সত্ত্বেও খুঁটি উপড়ে ফেলতে পারেনি। কারণ পায়ে বাঁধা শিকল তার সমস্ত আত্মশক্তি কেড়ে নিয়েছিল।
উপরের কথাগুলোও একধরনের শিকল – যা আপনার শিশুর পায়ে নয় , মনে বাঁধা হয়। যা বড় হওয়ার পরও তাকে অদৃশ্য খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। সে ডানা মেলে নীলাকাশে উড়তে পারে না।
এগুলো হচ্ছে ফরবিডেন ওয়ার্ডস। নিষিদ্ধ শব্দ।
– আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category