• রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৩ অপরাহ্ন

১১ দলীয় জোট: জামায়াতের সাথে বাড়ছে শরিকদের দূরত্ব

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রধান বিরোধী জোট ১১ দলীয় ঐক্যের ভেতরে এখন তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকট ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আসন ভাগাভাগি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জোটে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে শরিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। এই অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের সরাসরি প্রভাব এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে জোটের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে। অনেক শরিক দল ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে জোটের কর্মসূচি বর্জন করছে, আবার কেউ কেউ যৌথ আন্দোলনের পোস্টার ও ব্যানার থেকে নিজেদের শীর্ষ নেতাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি তুলছে। ফলে শরিকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দূরত্বের কারণে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন এই রাজনৈতিক মোর্চাটি এখন এক নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে।

সূত্রমতে, সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় এই দূরত্বের সূত্রপাত হয়। এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিকদের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা না করেই জামায়াত এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করায় ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে। জোটে কওমি ধারার যে চারটি শরিক দল অংশ নিয়েছিল, তাদের অন্যতম বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সবার আগে জোটের মাঠের কর্মসূচি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। গত বারোই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকেই দলটি জোটে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে প্রথম দিকে সক্রিয় থাকলেও আরেক শরিক দল খেলাফত মজলিসও সম্প্রতি জোটের ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগীয় সমাবেশ পুরোপুরি বর্জন করেছে এবং দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা আপাতত জোটের কোনো কার্যকলাপে অংশ নেবে না।

গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ঐক্যের অংশ হিসেবে কওমি ঘরানার যে দলগুলো অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুইটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়া প্রধান দুই অংশীদার জামায়াত আটষট্টিটি এবং এনসিপি ছয়টি আসনে জয়ী হয়। জোটগতভাবে মোট নব্বইটি আসন নিয়ে তারা সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও নির্বাচন পরবর্তী মূল্যায়ন না হওয়ায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খেলাফত মজলিসের তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, দেশের এগারোটি সিটি করপোরেশনে জামায়াত এককভাবে তাদের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে নিজেদের নির্বাচনী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, অথচ জোটের অন্যান্য শরিকদের কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকায় রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ফলে জোটে পুরনোদের চেয়ে নতুন নেতৃত্ব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অনেক শীর্ষ নেতা মনে করছেন। এমনকি আসন্ন বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশের প্রচারপত্রে শরিক দলগুলোর নেতাদের নাম না থাকায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে এবং খেলাফত আন্দোলন স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা আর এই জোটের অংশ নয়।

এই সমস্ত অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আসন বণ্টনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারকেরা জানিয়েছেন যে, এটি আসলে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক জোট ছিল না। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি কেবল একটি সাময়িক নির্বাচনী ঐক্য হিসেবে গঠিত হয়েছিল। তারা দাবি করেছেন যে, শরিকদের সাংগঠনিক অবস্থান, মাঠের জনশক্তি, নেতৃত্ব এবং বাস্তব জনসমর্থন বিবেচনা করেই নির্বাচনের সময় আসন সমন্বয় করা হয়েছিল। তাই আসন বণ্টন নিয়ে ওঠা ক্ষোভের অভিযোগগুলো মোটেও সঠিক বা যথার্থ নয়। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর কোনো কোনো শরিক দলের মধ্যে ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা ভিন্ন বক্তব্য থাকা রাজনৈতিক জোটে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে শরিকদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে তাদের একটি বিশেষ লিয়াজোঁ কমিটি নিয়মিত কাজ করছে এবং শরিকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়মিত বৈঠক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, নির্বাচনের সময় তাদের একটি আসনও ছেড়ে দেওয়া হয়নি, যা তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যথাযথ মূল্যায়নের অভাব এবং অবহেলার কারণেই তারা ধীরে ধীরে এই মোর্চা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছেন। দলটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনী সমঝোতা নির্বাচন শেষ হওয়ার সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে গেছে এবং তারা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। কওমি ধারার দলগুলোর এমন কঠোর অবস্থান এবং কর্মসূচি বর্জনের সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে যে, যথাযথ ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক মূল্যায়নের অভাব থাকলে কেবল ক্ষণস্থায়ী নির্বাচনী সমঝোতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জোটে রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হয় না।

তথ্যসূত্র: মানব জমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category