মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েল এই অঞ্চলে যে কৌশলী যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছে, তাকে অনেকেই ‘আগুন নিয়ে খেলা’ হিসেবে দেখছেন। নিজেদের কাঁধ থেকে যুদ্ধের দায়ভার কমাতে ওয়াশিংটন চাইলেও মিত্রদের এক কাতারে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর এই ব্যর্থতা কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং পশ্চিমা জোটের জন্য এক চরম অস্বস্তির নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো ইউরোপীয় মিত্ররা এবার আর অন্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি নয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো স্যাঞ্চেজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের ওপর হামলার জন্য স্পেনের কোনো সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এমনকি ব্রিটেনের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুও সরাসরি হামলায় অংশ না নিয়ে কেবল ‘আত্মরক্ষামূলক’ অবস্থানের কথা বলছে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে মিত্রদের যুদ্ধে বাধ্য করতে চায়, তবে তা ন্যাটো (NATO)-র মতো জোটকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিতে পারে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—বুঝতে পারছে আমেরিকার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কেবল ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষার জন্য। দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে তাদের জ্বালানি স্থাপনা ও অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বিকল্প শক্তি: জীবনপণ ঝুঁকিতে থাকা এই দেশগুলো এখন আর ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা করতে পারছে না। ফলে তারা চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা গত কয়েক দশকের মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে।
ইরানের প্রায় নয় কোটি জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ এবং সেখানে থাকা আফগান শরণার্থীরা যদি যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়, তবে ইউরোপের দিকে এক অভাবনীয় শরণার্থীর ঢল নামবে। ইউরোপ যেখানে বর্তমান অভিবাসন সংকট সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন এই ঢেউ ফ্রান্স, জার্মানি ও আটলান্টিক সম্পর্কের ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কৌশল হলো ইরানকে সামরিক বা অভ্যন্তরীণভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ধরণের জবরদস্তিমূলক শাসন পরিবর্তন (Regime Change) কেবল বিশৃঙ্খলা ও উগ্রবাদের জন্ম দেয়।
বুমেরাং: মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া এই শূন্যতা আমেরিকার তীরের দিকেই ধেয়ে আসবে। মিত্র হারানো, বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস এবং নতুন জঙ্গিবাদের উত্থান—সব মিলিয়ে একটি অস্থিতিশীল ইরান হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত কূটনীতি ও সংযমই পারে মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কৌশল যদি বুমেরাং হয়, তবে তার মূল্য কেবল আমেরিকা নয়, পুরো বিশ্বকেই দিতে হবে।