ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বাসিজ ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে তেহরান। এই ঘটনাকে ‘কাপুরুষোচিত’ আখ্যা দিয়ে এর চরম প্রতিশোধ নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে আইআরজিসি। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাহিনীটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শহীদ কমান্ডারের রক্তের বদলা নিতে তারা এক চুলও পিছু হটবে না। গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এক অভিযানে সোলাইমানিকে হত্যার দাবি করা হলেও শুরুতে তেহরান নীরব ছিল। তবে পরবর্তীতে আইআরজিসি আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে এই প্রতিশোধের ঘোষণা দেয়।
বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, এই আত্মত্যাগ ইরানি জাতি এবং বাসিজ যোদ্ধাদের প্রতিরোধের সংকল্পকে আরও দ্বিগুণ ও সুদৃঢ় করবে। গত ছয় বছর ধরে বাসিজ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা সোলেইমানি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আর্তমানবতার সেবায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। আইআরজিসির দাবি, ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রু’ বাহিনীর এই হামলা প্রমাণ করে যে চলমান যুদ্ধে বাসিজ বাহিনী কতটা শক্তিশালী ও কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। খুনি সন্ত্রাসীরা এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে বাহিনীটি জানিয়েছে, শহীদ নেতাদের প্রদর্শিত পথেই আগামী দিনে প্রতিরোধের লড়াই আরও বেগবান করা হবে। উল্লেখ্য, বাসিজ ফোর্স আইআরজিসির অধীনে পরিচালিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধা-সামরিক বাহিনী, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরাসরি ভূমিকা পালন করে।
সোলেইমানির এই হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক নজিরবিহীন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরমাণু ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। এই ঘটনার পর থেকেই পুরো অঞ্চলজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে ইরান প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে এর জবাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানছে।
এই সংঘাতের শেকড় মূলত গত বছরের ঘটনাবলির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত বছরের ১৩ জুন ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও ড্রোন সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সে সময় পেন্টাগন ইরানের তিনটি প্রধান পরমাণু কেন্দ্রে সফল হামলার দাবি করেছিল। টানা ১২ দিনের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে চরম অবিশ্বাস বজায় ছিল। সেই অবিশ্বাসেরই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটছে বর্তমান সংকটে। এদিকে, চলমান এই বহুমুখী সংঘাতের কোনো সুস্পষ্ট পরিণতি বা সময়কাল নির্ধারিত না থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে গভীর অর্থনৈতিক উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।