যেকোনো রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ ও প্রাচীন উপায় হলো—তার মাথা কেটে ফেলা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা যুগ যুগ ধরে এই কৌশল ব্যবহার করেছে। আধুনিক সামরিক কৌশলেও এই তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয়: সামনের সারির নেতৃত্বকে হত্যা করো, কমান্ড কাঠামো ভেঙে দাও, জনগণের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দাও—তারপর রাষ্ট্র এমনিতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
ইরানের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ছকটা প্রায় এমনই ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) যখন খবর ছড়ালো যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলায় নিহত হয়েছেন, তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে খেলা শেষ! পশ্চিমা বিশ্লেষকরা টেলিভিশন স্টুডিওতে বসে বুক ফুলিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের পতন ঘটবে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, শহর, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, এবং শীর্ষ কমান্ডারেরা একে একে নিহত হওয়ার পরও—মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরান ঠিকই টিকে আছে। কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ইরানকে শুধু একটি সাধারণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখলে হবে না; বুঝতে হবে এর বহুমাত্রিক ও জটিল ক্ষমতা-কাঠামো।
ব্যক্তি নয়, বরং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা
ইরানে ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা একটি জটিল ব্যবস্থার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা অবশ্যই রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রতীক, কিন্তু প্রতিটি স্তরেই বিকল্প নেতৃত্ব আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়। দাবা খেলায় যেমন মন্ত্রী কাটা পড়লে খেলা থেমে থাকে না, ইরানের রাষ্ট্রকাঠামোও ঠিক সেভাবেই কাজ করে।
এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)। অনেক বিশ্লেষক একে ‘রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেন। কারণ, এটি নিছক কোনো সেনাবাহিনী নয়; অর্থনীতি, গোয়েন্দা কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই তাদের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। যুদ্ধে আইআরজিসির বহু শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের চেইন অব কমান্ড এতটাই বিকেন্দ্রীভূত ও সুসংগঠিত যে, একজন কমান্ডার নিহত হওয়ার সাথে সাথেই বিকল্প আরেকজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দায়িত্ব বুঝে নেন। এখানে নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার বিষয় নয়, বরং এটি একটি অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা।
বাসিজ বাহিনী এবং জাতীয় ঐক্যের মনস্তত্ত্ব
ইরানের টিকে থাকার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের ‘বাসিজ বাহিনী’—যা প্রায় ১০ লাখ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক সংগঠন। যুদ্ধ শুরুর পর অনেকেই ভেবেছিলেন শহরগুলো অরাজকতায় ডুবে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাসিজ সদস্যরা রাস্তায় নেমে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সরকার দ্রুত ইন্টারনেট সীমিত করে দেওয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধতে পারেনি।
তবে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি কাজ করেছে তা হলো—জাতীয়তাবাদের উত্থান। যুদ্ধের একটি অলিখিত নিয়ম আছে: বাইরের আক্রমণ প্রায় সবসময়ই ভেতরের বিভাজন কমিয়ে দেয়। ইরানের সমাজ নানা মতাদর্শে বিভক্ত হলেও, বিদেশি হামলার মুখে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। মানুষ এখন রাষ্ট্রকে কেবল একটি সরকার হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছে। এমনকি যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ইরানি নারীদের নিজেদের গহনা পর্যন্ত দান করার দৃশ্য এই জাতীয় ঐক্যেরই প্রমাণ।
দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও ভৌগোলিক শক্তি
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ তাদের বাধ্য করেছে অর্থনীতি থেকে শুরু করে সামরিক প্রযুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার চেষ্টা করতে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই আজ তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় গলায় দাবি করছিল যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, ঠিক তখনই ভারত মহাসাগরে প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দূরের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘দিয়েগো গার্সিয়া’র দিকে ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পশ্চিমা দাবি কতটা অন্তঃসারশূন্য।
আন্তর্জাতিক সমীকরণ এবং অদৃশ্য নেতৃত্ব
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণও ইরানকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। চীন ও রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও, কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে তারা ইরানকে একঘরে হতে দেয়নি। এই বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
অন্যদিকে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে খুব কমই দেখা যাচ্ছে। অনেকেই একে দুর্বলতা ভাবলেও, এটি মূলত তাঁদের গভীর নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। নেতৃত্ব যত অদৃশ্য থাকবে, তাকে লক্ষ্যবস্তু করা ততটাই কঠিন হবে।
রাষ্ট্র কি কেবল ব্যক্তি, নাকি একটি ধারণা?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভেবেছিল, শুধু মাথা কেটে ফেললেই রাষ্ট্রের পতন ঘটবে। কিন্তু তারা সম্ভবত একটি মৌলিক বিষয় অবমূল্যায়ন করেছে—কিছু রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তির দ্বারা নয়, বরং একটি ‘ধারণা’ বা আদর্শের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। আর ধারণাকে বোমা মেরে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।
ইরান এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিরোধ কেবল একটি রাজনৈতিক নীতি নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পরও যে যুদ্ধ সমান বা আরও তীব্র গতিতে চলছে, তা আধুনিক যুদ্ধের প্রকৃতি নিয়েই নতুন এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: একবিংশ শতাব্দীতে কি সত্যিই কোনো রাষ্ট্রকে শুধু ‘মাথা কেটে’ পরাজিত করা সম্ভব? নাকি পৃথিবী এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলো ব্যক্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে?