• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্বে ইরানের বাঘের গালিবাফ: কে এই দাপুটে নেতা?

Reporter Name / ৭৪ Time View
Update : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ক্রমেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ আলোচনার ক্ষেত্রে এখন তাকেই প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল থেকে জানা গেছে।

ইসরায়েলের ‘হিট লিস্ট’ থেকে বাদ পড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের একটি পদস্থ সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি স্পিকার বাঘের গালিবাফকেও ইসরায়েলের গুপ্তহত্যার ‘হিট লিস্ট’ থেকে আপাতত বাদ দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানি ওই সূত্রটি জানায়, “ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে আরাগচি ও গালিবাফের অবস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল এবং তারা এই দুই নেতাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, যদি এদেরও হত্যা করা হয়, তবে তেহরানের সঙ্গে কথা বলার মতো বা আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। মূলত এই সতর্কবার্তার পরই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই গুপ্তহত্যা থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে।”

যদিও ৬৪ বছর বয়সী গালিবাফ সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছিলেন, “আমাদের ভূমি রক্ষার সংকল্পকে কেউ যেন পরীক্ষা করতে না আসে।” তিনি অবিরাম হামলার হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’র মতে, এত কড়া কথার পরও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তা গালিবাফকে এমন একজন ‘বাস্তববাদী অংশীদার’ হিসেবে দেখেন, যার সাথে অন্তত কাজ চালানো বা আপস-আলোচনা করা সম্ভব।

যে কারণে ক্ষমতার কেন্দ্রে গালিবাফ

অতীতে একাধিকবার ইরানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও গালিবাফ সফল হতে পারেননি। এমনকি ২০২৪ সালে ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তিনি একজন হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু জয় পাননি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হওয়ায় ক্ষমতার একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

এই শূন্যস্থান পূরণে গালিবাফ এখন সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী। কারণ, ইরানের অভিজাত ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর সাথে তার দীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার বিস্তর অভিজ্ঞতা এবং একজন ‘কট্টরপন্থী অথচ বাস্তববাদী’ নেতা হিসেবে তার ভাবমূর্তি তাকে ইরানের ক্ষমতার এক নতুন ও সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।

বিপ্লবী তরুণ থেকে আইআরজিসি কমান্ডার: ‘লাঠি হাতে গর্বিত’

গালিবাফের জন্ম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোরঘাবেহ-র একটি সাধারণ, ধর্মপ্রাণ শ্রমিক পরিবারে। তার শহরের কাছেই পবিত্র নগরী মাশহাদের অবস্থান, যেখানে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের অনেক শীর্ষ নেতার বসবাস ছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি মাশহাদের প্রধান মসজিদগুলোতে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্যান্য বিপ্লবী আলেমদের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের ক্লাসে অংশ নিতে শুরু করেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই তিনি ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন এবং মাত্র ২০ বছর বয়সে আইআরজিসিতে যোগ দেন। অসাধারণ সামরিক দক্ষতার কারণে মাত্র দুই বছর পরই তিনি আইআরজিসির একটি কমব্যাট ডিভিশনের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই পদে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আইআরজিসি কমান্ডার হওয়ার বছরেই গালিবাফ বিয়ে করেন এবং তার সেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা স্বয়ং সম্পন্ন করেছিলেন ইসলামি বিপ্লবের রূপকার সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি।

যুদ্ধের পর গালিবাফের উত্থান আরও ত্বরান্বিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে তিনি আইআরজিসির বিমানবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে ইরানে একটি সংস্কারপন্থী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা অত্যন্ত সহিংসভাবে দমন করা হয়েছিল। এই দমন-পীড়নে গালিবাফের সরাসরি ইন্ধন ও সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডে তাকে দম্ভভরে বলতে শোনা যায়, “১০০০ সিসির মোটরবাইকে লাঠি হাতে আমার একটি ছবি আছে… যখনই রাস্তায় নেমে লাঠি ব্যবহার করে বিদ্রোহ দমনের প্রয়োজন হয়, আমরাই সবার আগে সেই কাজ করি। আর আমরা এটা নিয়ে ভীষণ গর্বিত।”

ওই বিক্ষোভের পর আইআরজিসির ২৪ জন কমান্ডার তৎকালীন সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামিকে একটি চরমপত্র বা কড়া ভাষায় চিঠি লিখে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। গালিবাফ পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে, তিনি ওই চিঠির খসড়া প্রণয়নকারী ও স্বাক্ষর সংগ্রহকারী দুই কমান্ডারের একজন ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওই চিঠিটিই ছিল ইরানের রাজনীতিতে আইআরজিসির প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত আধিপত্য বিস্তারের প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

পুলিশ প্রধান থেকে তেহরানের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মেয়র

ছাত্র বিক্ষোভের ঠিক এক বছর পর মাত্র ৩৯ বছর বয়সে গালিবাফ ইরানের জাতীয় পুলিশ প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তার পাঁচ বছরের সফল কার্যকালে তিনি জাতীয় ইমার্জেন্সি পুলিশ হটলাইন (১১১) চালু করেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া অনেক সহজ করেন।

২০০৫ সালে পুলিশ প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। তবে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তেহরানের সিটি কাউন্সিল তাকে রাজধানীর মেয়র হিসেবে নিযুক্ত করে। তিনি টানা ১২ বছর এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যা তেহরানের ইতিহাসে কোনো মেয়রের দীর্ঘতম মেয়াদ। মেয়র হিসেবে তিনি যানজট নিরসনে মেট্রো ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং ‘সদর এক্সপ্রেসওয়ে’র মতো আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রশংসিত হন।

তবে তার মেয়াদের শেষ দিকে ২০১৬ সালে ‘বিপুল মূল্যের সম্পত্তি কেলেঙ্কারি’র খবর ফাঁস হলে তার সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। অভিযোগ ওঠে যে, তিনি সিটি কাউন্সিলের শত শত দামি সম্পত্তি সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে বাজার মূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। এর কিছুদিন পরই তেহরানের অন্যতম প্রাচীন ১৭ তলা বিশিষ্ট ‘প্লাস্কো বিল্ডিং’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধসের ঘটনায় অন্তত ২০ জন দমকলকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যা গালিবাফের নগর প্রশাসনে পদ্ধতিগত অবহেলা ও দুর্নীতির চিত্র সবার সামনে তুলে ধরে। এত কিছুর পরও কোনো কেলেঙ্কারি বা ব্যর্থতার জন্যই তাকে বরখাস্ত বা অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং এই সব বিতর্ক পেছনে ফেলে ২০২০ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি সরাসরি স্পিকারের চেয়ারে বসেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার অধরা স্বপ্ন এবং দুর্নীতি বিতর্ক

গালিবাফের মূল লক্ষ্য সবসময়ই ছিল প্রেসিডেন্ট হওয়া। কিন্তু ২০০৫, ২০১৩, ২০১৭ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও তিনি ব্যর্থ হন। প্রথমদিকে তিনি তার সামরিক পরিচয় ও আইআরজিসি ব্যাকগ্রাউন্ডকে বেশি পুঁজি করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজেকে একজন ‘বাস্তববাদী জিহাদি সংগঠক’, পাইলট এবং পলিটিক্যাল জিওগ্রাফিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।

দীর্ঘদিন ধরে চরম কট্টর ও সংস্কারবিরোধী হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গালিবাফ কট্টরপন্থীদের একটি বড় অংশের বিরাগভাজন হয়েছেন। ২০২২ সালে তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে তার পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল শিশু সামগ্রী (স্ট্রলারসহ) নিয়ে আসার ছবি ফাঁস হলে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সমালোচকরা তাকে ‘ভণ্ড ও কপট’ আখ্যা দিলেও, তিনি দাবি করেন যে এসব অভিযোগ পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই ‘সিমসনিগেট’ (শিশুর সামগ্রী কেনাকাটার কেলেঙ্কারি) বিতর্কও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে পারেনি; বরং তিনি ২০২৪ সালে পুনরায় পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত হন।

আগামীর সমীকরণ

ইরান বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতা। এমন একটি টালমাটাল পরিস্থিতিতে, সামরিক অভিজ্ঞতা, আইআরজিসির সাথে সুসম্পর্ক এবং সরকারের প্রধান তিনটি শাখার (নির্বাহী, আইন ও বিচার) সাথে সমন্বয় করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এখন ইরানের রাজনীতির সবচেয়ে অপরিহার্য চরিত্র হয়ে উঠেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ ও কূটনৈতিক চালেই হয়তো তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার অধরা স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category