গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দামের আগুনে এমনিতেই পুড়ছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই নতুন দুঃসংবাদ হয়ে আসছে বিদ্যুতের বাড়তি বিল। ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এখন সরকারের টেবিলে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ইতোমধ্যে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করেছে, যা শিগগিরই মন্ত্রিসভায় পেশ করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। লাইফলাইন গ্রাহক (শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট) থেকে শুরু করে সব স্তরেই এই দাম বাড়তে পারে।
কেন বাড়ছে দাম? পিডিবির দাবি বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ভাষ্যমতে, বর্তমানে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১২ টাকা, কিন্তু পাইকারি পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে সরকারকে ৫ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই হিসাবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়!
সরকার এই বিশাল ঘাটতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্তকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে।
বিপিসির লাভ, পিডিবির লোকসান: এ কেমন অর্থনীতি?
বিদ্যুৎ খাতের এই চরম আর্থিক সংকটের পেছনে জ্বালানি তেলের দামের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল বিক্রি করে ৪,৩১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লাভের বড় অংশই এসেছে পিডিবির কাছে চড়া দামে ফার্নেস অয়েল বিক্রির মাধ্যমে।
পিডিবির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিপিসি থেকে উচ্চমূল্যে তেল কিনেই তারা আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত একটি সংস্থা লাভ করবে আর অন্যটি লোকসানের দোহাই দিয়ে জনগণের পকেট কাটবে—এটি কোনোভাবেই টেকসই অর্থনৈতিক সমাধান হতে পারে না।
নেপথ্যের আসল কারণ: ক্যাপাসিটি চার্জ ও লুটপাট
বিশেষজ্ঞরা সরকারের যুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের মতে, বিগত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে যে বিশাল লুটপাট হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর নামে অলিগার্কদের (প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী) হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, মূলত তার দায়ই এখন সাধারণ জনগণকে বইতে হচ্ছে।
এছাড়া প্রাথমিক জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত কয়লা, এলএনজি এবং ফার্নেস অয়েলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতাও একটি বড় কারণ। ডলারের দাম বাড়লেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এদিকে নজর দেওয়া হয়নি। উল্টো বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ইউনিটপ্রতি ১৫ টাকার ওপরে দেখানো হচ্ছে, যা প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই যুগে রীতিমতো অস্বাভাবিক।
চেইন রিঅ্যাকশন: সাধারণ মানুষের জীবনে অশনিসংকেত
বিদ্যুতের দাম বাড়া মানে শুধু মাস শেষে বিলের কাগজে সংখ্যা বাড়া নয়। এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করবে:
বাড়িভাড়া বৃদ্ধি: বিদ্যুতের বিল বাড়ার অজুহাতে বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন।
পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়লে চাল, ডাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
মূল্যস্ফীতির চরম রূপ: স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যাবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে একেবারে তলানিতে নিয়ে যাবে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে আমদানি-নির্ভরতার এই পথ না বদলালে, আগামীতে বিদ্যুতের দাম আরও কয়েক দফা বাড়লেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
যদিও পিডিবির চেয়ারম্যান বলছেন দাম বাড়ানোর বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং সারসংক্ষেপ তৈরি হওয়া মানেই দাম বাড়ার ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, লুটপাটের এই বিশাল দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপে কি না!