রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ ও গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া গণমাধ্যম দলনের নানা বিতর্কিত আইনের সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করার যে প্রতিশ্রুতি বর্তমান সরকার দিয়েছে, এই বৈঠককে তার একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। আজ রোববার (১৭ মে) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এখানে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ (সাবেক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) নানা নিবর্তনমূলক আইনের কারণে দেশের সাংবাদিকতা যে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি ভীতিহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—তা নিয়ে শীর্ষ সম্পাদকরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতে তার সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতার কথা ব্যক্ত করেছেন।
এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক এবং দেশের সাংবাদিকতার দিকপালরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উপস্থিত থেকে সরকারের গণমাধ্যম নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ টিমের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনও এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, দেশের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর শীর্ষ নেতারা এই বৈঠকে অংশ নেন। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউএজ-এর সম্পাদক নুরুল কবির এবং সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দেশের সাংবাদিকতা জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ—দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এবং প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। এছাড়া দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ এবং দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক এই বৈঠকে অংশ নিয়ে জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের নানা সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সম্মানে এক বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। মধ্যাহ্নভোজের এই অনানুষ্ঠানিক আবহেও প্রধানমন্ত্রী ও সম্পাদকদের মধ্যে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট কাটিয়ে সরকার এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি গঠনমূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে আজকের এই বৈঠক এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহল।