• সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪০ অপরাহ্ন
Headline
ডেঙ্গুতে আরও চার জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি হাজারের বেশি অর্থনীতির ভিত্তি গড়েছিলেন সাইফুর রহমান: রিজভী জামায়াত আমিরের হায়াতে তাইয়েবা, সবরে জামিল আতা ফরমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারের’ নাম পরিবর্তনের দাবি এমপি মারদিয়ার পাটওয়ারীর পর এবার আসিফ মাহমুদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন পালিয়ে বিয়ে, ইসলাম কী বলে? ১৭ সেপ্টেম্বর কার্ড পাবেন এক লাখ কৃষক স্ত্রীসহ সাবেক ভূমিমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের তথ্য পাঠাল এফবিআই হিজড়া ‘গুরুমা’ মৌসুমী হত্যায় গ্রেপ্তার মোমিন পুলিশকে যে তথ্য দিলেন জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে বিরোধ: সরকার-বিরোধী দল উত্তেজনা বাড়ছে

সুলভ ফলে নীরব বিষের ছায়া: বাণিজ্যিক পেয়ারায় অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ভারী ধাতু

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম, সহজ প্রাপ্যতা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় পেয়ারা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ফল| বিশ্বজুড়ে পেয়ারা উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম| কিন্তু বহুল ব্যবহৃত ও পুষ্টিকর এই ফলটি নিয়েই সম্প্রতি এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য জনসমক্ষে এসেছে| রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার বাণিজ্যিক বাগানগুলো থেকে সংগ্রহ করা পেয়ারায় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার অতিরিক্ত উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে| আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যায় প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসে| গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগৃহীত পেয়ারার সিংহভাগেই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে বহু গুণ বেশি বিষাক্ত উপাদানের অবশিষ্টাংশ মিশে রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষত শিশুদের জন্য এক নীরব অশনিসংকেত|
গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন| তাঁর সঙ্গে দলভুক্ত হয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরও ছয়জন অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষক| গবেষক দলটি রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট—এই আটটি কৃষিপ্রধান জেলার মোট দশটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কাজ শুরু করেন| গবেষণার বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে প্রতিটি এলাকায় পাশাপাশি থাকা একটি বাণিজ্যিক পেয়ারা বাগান এবং প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বের একটি সাধারণ বাড়ির গৃহস্থালি বাগান নির্বাচন করা হয়| নির্বাচিত প্রতিটি গাছ থেকে পরিপক্ব তিনটি করে পেয়ারার নমুনা গবেষণাগারে এনে ‘প্লাজমাভিত্তিক আলোক নিঃসরণ বর্ণালিবীক্ষণ’ বা অপটিক্যাল এমিশন স্পেকট্রোমেট্রি প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রাসায়নিক পরীক্ষা চালানো হয়| প্রায় আট মাসব্যাপী চলা এই দীর্ঘ গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য ফলের মধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান কীভাবে এবং কী মাত্রায় অনুপ্রবেশ করছে তা পরিমাপ করা|
গবেষণাগারের ফলাফল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা চারটি ক্ষতিকর ভারী ধাতুর—আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার উপস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন| প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চার ধরনের ধাতুর ঘনত্বই সাধারণ পারিবারিক বা বাড়ির বাগানের পেয়ারার তুলনায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা পেয়ারায় বহুগুণ বেশি পাওয়া গেছে| বিশেষ করে ক্যাডমিয়ামের মাত্রাটি বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি শঙ্কাগ্রস্ত করে তুলেছে| বাণিজ্যিক বাগানের সংগৃহীত মোট পেয়ারার প্রায় ৯০ শতাংশ নমুনাতেই অনুমোদিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে| যেখানে একজন মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তায় পেয়ারায় ক্যাডমিয়ামের সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিগ্রাম, সেখানে বাণিজ্যিক পেয়ারায় এর সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ১ দশমিক ৮৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত| এমনকি তুলনামূলক নিরাপদ থাকা বাড়ির বাগানেরও প্রায় ২০ শতাংশ পেয়ারায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সীমার বাইরে পাওয়া যায়|
মারাত্মক স্নায়বিক ও শারীরিক ক্ষতির জন্য দায়ী সিসার ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে এক ভয়াবহ চিত্র| খাদ্য নিরাপত্তা বিধিমালার অনুমোদিত সীমা অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেয়ারায় সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ধরা হয় সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক এক মিলিগ্রাম| অথচ বাণিজ্যিক বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ পেয়ারার নমুনাতেই সিসার এই গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে এবং সর্বোচ্চ ঘনত্ব ধরা পড়েছে প্রতি কেজিতে ২ দশমিক শূন্য পাঁচ মিলিগ্রাম পর্যন্ত| তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গৃহস্থালি বা বাড়ির আঙিনার পেয়ারার কোনো নমুনাতেই সিসার মাত্রা নিরাপদ সীমার বাইরে যায়নি| একইভাবে আর্সেনিকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বাগানের ৩০ শতাংশ পেয়ারায় সহনশীল মাত্রা প্রতি কেজিতে এক মিলিগ্রামের চেয়ে বেশি ছিল এবং এর সর্বোচ্চ ঘনত্ব মিলেছে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৮৪ মিলিগ্রাম| তামার ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক পেয়ারার অর্ধেক নমুনাতেই অনুমোদিত সীমা ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রামের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক শূন্য চার মিলিগ্রাম পর্যন্ত মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত বিপজ্জনক|
পেয়ারার মতো একটি জনপ্রিয় ফলের মাধ্যমে এই ভারী ধাতুগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে কী ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা পরিমাপের জন্য গবেষক দল যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা বা ইউএস ইপিএ-র মানসম্মত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন| এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের গড় দৈহিক ওজন, তাদের দৈনিক ফল খাওয়ার হার এবং পেয়ারায় প্রাপ্ত ভারী ধাতুর মাত্রা ইত্যাদি বিষয় বিশদভাবে সমন্বয় করা হয়| ঝুঁকি মূল্যায়নের চূড়ান্ত চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি বাণিজ্যিক পেয়ারার নমুনার ক্ষেত্রে শিশুদের শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট রূপ ধারণ করেছে| গবেষকদের মতে, শিশুদের শারীরিক ওজন প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় দূষিত ফল গ্রহণের ফলে তাদের রক্ত ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গে ভারী ধাতুর ঘনত্ব অতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়| নিয়মিত ও দীর্ঘ মেয়াদে এই ফল গ্রহণের মাধ্যমে শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়া, রক্তের রোগ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডনি বিকল ও ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার স্পষ্ট আশঙ্কা তৈরি হয়|
তবে এই ভারী ধাতুগুলো ঠিক কোন সরাসরি মাধ্যম দিয়ে পেয়ারা গাছে সংক্রমিত হচ্ছে, তা এই গবেষণার আওতায় সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি| গবেষণাপত্রেই গবেষকরা এই সীমাবদ্ধতার কথা খোলাখুলি তুলে ধরেছেন| কারণ যে বাগানের গাছগুলো থেকে ফল নেওয়া হয়েছে, সরাসরি সেই মাটির প্রকৃতি কিংবা সেচ দেওয়া পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি| বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাণিজ্যিক চাষাবাদে অতিরিক্ত ফলন নিশ্চিত করতে কৃষকদের অপরিকল্পিতভাবে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও শক্তিশালী কীটনাশক প্রয়োগ করার কারণেই মূলত মাটিতে ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো উপাদানগুলো জমতে থাকে| এছাড়া দূষিত ভূগর্ভস্থ বা কারখানার বর্জ্যমিশ্রিত পানির সাহায্যে সেচ প্রদান, কৃষিজমির কাছাকাছি অবস্থিত শিল্পকারখানার বিষাক্ত নির্গমন কিংবা যানবাহনের কালো ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক বাতাসে ভেসে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলেও এই দূষণ ঘটতে পারে|
গবেষক দলের প্রধান মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে কৃষিব্যবস্থায় নিরাপদ চর্চা জোরদার করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন| তিনি উল্লেখ করেন, এই গবেষণাটি রাজশাহী বিভাগের দশটি অঞ্চলের নমুনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, তাই দেশের সব অঞ্চলের বাণিজ্যিক পেয়ারা একইভাবে বিষাক্ত বা দূষিত—এমন ঢালাও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না| তবে সাধারণ মানুষ যে ফলগুলোকে নিরাপদ ভেবে নিয়মিত সন্তানদের পাতে তুলে দিচ্ছেন, সেগুলোর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি| এই দূষণ নিয়ন্ত্রণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের নজরদারি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন| কৃষকরা জমিতে কোন মাত্রার সার ও অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করছেন, সেগুলোর মান আন্তর্জাতিক মানের কি না, তা যাচাইয়ে নিয়মিত সরকারি তদারকি কাঠামো তৈরি করতে হবে| সর্বোপরি সরকারের ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মাটিতে ভারী ধাতুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে এবং দেশের সাধারণ ভোক্তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফলের বাজার গড়ে উঠবে|
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category