বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের চিত্র নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে সম্প্রতি তা যে সহিংস ও সংঘাতময় রূপ নিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় একদিকে যেমন অগ্নিসংযোগ ও জানমালের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে পুলিশের অমানবিক নির্যাতনও প্রত্যক্ষ করা গেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। শিল্প রক্ষা এবং শ্রমিকের যৌক্তিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
শ্রমিকদের এই তীব্র ক্ষোভের মূল কারণ হলো জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের চরম অসঙ্গতি। বর্তমান বাজারে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সরকারি তথ্যমতেই দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষকে ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে, যার মধ্যে সিংহভাগই গার্মেন্টস শ্রমিক। ২০২৩ সালে ঘোষিত সাড়ে ১২ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি দিয়ে বর্তমান বাজারে চার সদস্যের একটি পরিবারের ভরণপোষণ অসম্ভব। যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মচারীদের ২০তম গ্রেডের সুযোগ-সুবিধাসহ বেতন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা, সেখানে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি পুরোপুরি ন্যায়সঙ্গত। আইন অনুযায়ী, তিন বছর পর পর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেই হিসাবে ২০২৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হওয়ার কথা। সরকার দেরিতে হলেও ১ নভেম্বর ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, যা একটি ইতিবাচক প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে শুধু বোর্ড গঠনই যথেষ্ট নয়, বড় চ্যালেঞ্জ হলো কত দ্রুত এই মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা যায়।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, বর্তমানে একটি সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার জন্য মাসে অন্তত ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। সেই তুলনায় বিক্ষোভের সময় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে উচ্চারিত ৩০ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরির দাবিকে কোনোভাবেই অযৌক্তিক বলার সুযোগ নেই। মালিকপক্ষ ব্যবসার মন্দা বা ক্রেতাদের সংকটের অজুহাত তুলতে পারেন, কিন্তু শ্রমিকের পেট খালি রেখে শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। শ্রমিক যদি খেয়ে-পরে বাঁচতেই না পারে, তবে উৎপাদনশীলতা আসবে কোথা থেকে? শিল্প রক্ষা করতে হলে শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তবে একই সঙ্গে শিল্পের গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে সরকারকে মালিকপক্ষের সংকট মোচনেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
মজুরি সংকটের পাশাপাশি শ্রমিকদের ক্ষোভের পেছনে আরও কিছু গভীর সমস্যা কাজ করছে। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে ছাঁটাই হওয়া বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকাভুক্ত করে অন্য কারখানায় কাজে নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি লাখের কাছাকাছি শ্রমিক এভাবে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে, তবে সেই অসন্তোষ যেকোনো সময় গণবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে। এ ছাড়া, কাগজে-কলমে ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও অধিকাংশ কারখানায় নির্বাচিত ও কার্যকর স্বাধীন কোনো সংগঠন নেই, যা মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারত।
শিল্পের চাকা সচল রাখতে হলে সরকারকে অবিলম্বে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। আগামী দিনে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা শ্রমিক অসন্তোষকে আরও উসকে দিতে পারে। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এই নতুন মজুরি যেন আগামী ডিসেম্বর মাস থেকেই কার্যকর হয় এবং শ্রমিকরা যেন মাসের শেষে তা হাতে পান, সেই সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা সরকারের প্রধান কর্তব্য। পোশাকশিল্পের স্থায়িত্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে শ্রমিকের জীবনমান রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।