একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো তার তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘জনমিতির লভ্যাংশ’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। বাংলাদেশ বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি সময় পার করছে, যেখানে নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, যথাযথ নীতিমালার অভাব এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতার কারণে এই অমূল্য সুযোগটি হাতছাড়া হতে চলেছে। সম্প্রতি ৩ নভেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন আমাদের এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো তার এই অনুকূল জনসংখ্যার গঠনকে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে পারেনি। ২০৪৫ সালের দিকে আমাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে আর মাত্র দুই দশকের মতো সময় আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এই বিশাল সম্ভাবনাকে আমরা কেবল অপচয়ই করছি না, বরং এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
আমাদের কর্মসংস্থান খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা অত্যন্ত প্রকট। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ, যা মোট নিয়োজিত জনশক্তির ৮৪ শতাংশ, অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাতে কর্মরত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ৪৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের আনুষ্ঠানিক বা ফরমাল সেক্টরগুলো পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে পরিচিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (SME) গড়ে তাদের কর্মীসংখ্যা সংকুচিত করছে। দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও সেই শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার কোনো মিল নেই। ফলে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল ‘দক্ষতার ঘাটতি’। শিক্ষাকে কেবল সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি বাজারমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর না করা যায়, তবে শিক্ষিত বেকারত্বের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
জনমিতির লভ্যাংশ অর্জনের পথে আরেকটি বড় অন্তরায় হলো শ্রমবাজারে নারীর নিম্ন অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার যেখানে ৭৮ শতাংশ, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩৬ শতাংশ। দেশের কোনো বিভাগেই নারীর এই অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশের ওপরে নয়। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের কোণে বসিয়ে রেখে বা তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে অবমূল্যায়ন করে কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। নারীদের কর্মসংস্থানের পথে থাকা সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধাগুলো দূর করা সরকারের জন্য এখন সময়ের দাবি।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সংকট কেবল বর্তমানের বেকারত্ব বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিধ্বংসী সামাজিক প্রভাব রয়েছে। ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি প্রবীণ প্রধান দেশে পরিণত হবে, যখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশেরই বয়স হবে ৬৫ বছরের ওপরে। যদি এখনই আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দেওয়ার মতো আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এই অর্থনীতির থাকবে না। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জনমিতির পরিবর্তন যেখানে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বার্ষিক ০.৪ শতাংশ অবদান রেখেছিল, ২০২৫ থেকে ২০৪৪ সালের মধ্যে তা কমে মাত্র ০.২ শতাংশে নেমে আসবে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ দেখানো হলেও, বাস্তব চিত্র আরও অনেক জটিল। কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, পারিবারিক সঞ্চয় এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করেই আমরা একটি প্রবীণ সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যা ভবিষ্যতে প্রতিটি পরিবারের ওপর এক বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রীক রৈখিক উন্নয়ন মডেল থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কেবল জিডিপির খতিয়ান না দেখে ‘মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান’ সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল মাপকাঠি বানাতে হবে। কর্মসংস্থান সহায়ক শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই জানালা চিরকাল খোলা থাকবে না। এই সীমিত সময়ের মধ্যে যদি আমরা আমাদের তরুণ ও নারী শক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই নীতিগত ব্যর্থতার চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য চোকাতে হবে। সরকার কি এই সতর্কবার্তা আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?