ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে এগিয়ে না আসায় ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মিত্র দেশগুলোর এই নিষ্ক্রিয়তাকে সরাসরি ‘বোকামি’ আখ্যা দিয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই সংঘাত মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আসলে তাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তবে পারস্য উপসাগরে মাইন পরিষ্কার করার জাহাজ বা মাইন-সুইপার পাঠাতে মিত্রদের এই অনীহাকে তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি চরম ‘অন্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্রদের প্রতি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বৈঠক চলাকালে ট্রাম্প জানান, ন্যাটোর অধিকাংশ মিত্র দেশ এরই মধ্যে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই যুদ্ধে জড়াতে ইচ্ছুক নয় এবং অনেকেই এই সংঘাতকে ‘অবৈধ’ বলে মনে করছে। দৃশ্যত ক্ষুব্ধ ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ন্যাটোর কাছ থেকে তাদের কোনো সাহায্যের দরকার নেই, কিন্তু নীতিগতভাবে তাদের সেখানে থাকা উচিত ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বর্তমান ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্টারমার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত লন্ডন ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক সবসময় ‘সবচেয়ে ভালো’ ছিল। ন্যাটোর প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে ট্রাম্প আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে ইউক্রেনকে দেওয়া আমেরিকার কোটি কোটি ডলারের সহায়তার সুফল এই মিত্ররাই ভোগ করেছে। অথচ প্রয়োজনের সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। এই অসহযোগিতার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো পাল্টা ব্যবস্থার কথা না ভাবলেও এটিকে সম্পর্কের জন্য একটি ‘বড় পরীক্ষা’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
এদিকে, ইউরোপের শীর্ষ নেতারাও এই যুদ্ধে না জড়ানোর বিষয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, তারা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নন, তাই হরমুজ প্রণালি সচল করার কোনো সামরিক অভিযানে ফ্রান্স অংশ নেবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাসও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এটি কোনোভাবেই ইউরোপের যুদ্ধ নয়। কারণ, এই যুদ্ধ তারা শুরু করেননি এবং এ বিষয়ে ইউরোপের সঙ্গে আগে থেকে কোনো ধরনের পরামর্শও করা হয়নি। যুক্তরাজ্য ও জার্মানির মতো পরাশক্তিগুলোও আপাতত কোনো ধরনের সামরিক পাহারায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিত্রদের আপত্তির পাশাপাশি খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি প্রকাশ্যে এসেছে। ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের (এনসিটিসি) পরিচালক জো কেন্ট পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে পদত্যাগপত্রে তিনি দাবি করেন, ইরান আমেরিকার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি করেনি। তবে জো কেন্টের এই দাবির কড়া সমালোচনা করে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসী গ্যাবার্ড প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণের পরই ট্রাম্প নিশ্চিত হয়েছিলেন যে তেহরান থেকে আমেরিকার ওপর বড় ধরনের হামলার সুস্পষ্ট হুমকি রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই এই দাবি করে আসছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে পণ্য চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এর মধ্যেই ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার এবং কুয়েতের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম নীতি-নির্ধারণী বৈঠকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরাজয় মেনে নিয়ে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বাসিজ মিলিশিয়া প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানির নিহতের বিষয়টিও মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে তেহরান প্রশাসন।