মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবার এক ভয়াবহ রূপ নিল। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। বুধবার (১৮ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ৫ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘ডিপ পেনিট্রেটর’ বা বাঙ্কার বাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিশেষায়িত বোমাগুলো মাটির গভীরে কিংবা পাহাড়ের ভেতরে অবস্থিত কংক্রিটের মজবুত স্থাপনা ধ্বংস করতে সক্ষম। প্রতিটি বোমার নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার মার্কিন ডলার। সেন্টকমের দাবি, ওই ঘাঁটিগুলোতে মজুদ করা জাহাজ বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা ধ্বংস করা ব্যতিরেকে বিকল্প কোনো পথ ছিল না।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। গত কয়েকদিন ধরে ইরানের কঠোর অবরোধের কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিশ্ব তেলের বাজারে। তেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ায় ওয়াশিংটন এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মার্কিন প্রশাসনের মতে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
এই সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্র দেশগুলোকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে অধিকাংশ সদস্য দেশ এই মুহূর্তে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। মিত্রদের এমন অবস্থানে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা এবং বিশ্ব অর্থনীতি রক্ষা করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মিত্রদের সহায়তা না পেলেও মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তিনি পিছু হটবেন না।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে উৎসাহিত করে আসলেও, এই হামলার বিষয়ে ট্রাম্প ভিন্ন সুর দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এটি কোনো বিদেশি প্ররোচনায় নয়, বরং পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে তার নিজস্ব ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। লারিজানির মৃত্যুর পর ইরানের কমান্ড কাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষিতে এই হামলা তেহরানের সামরিক সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।