• রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ন

ইরানের পরমাণু ও ইস্পাত কারখানায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা: পাল্টা জবাবের কড়া হুঁশিয়ারি তেহরানের

Reporter Name / ৮০ Time View
Update : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি আরও একধাপ উসকে দিয়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনা এবং অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানায় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) এই যৌথ সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ঘটে। সংঘাতের ২৮তম দিনে এসে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের যে নতুন কৌশল ইসরায়েল নিয়েছে, তা পুরো অঞ্চলকে একটি সর্বগ্রাসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে এর ‘ভারী মূল্য’ চোকাতে হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে তেহরান।

পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মধ্য ইরানের ইয়াজদ শহরের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া আরাকে অবস্থিত হেভি ওয়াটার সেন্টার এবং বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশেও বিমান হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর একটি ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা’ ধ্বংস করেছে, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল প্রস্তুত করা হতো।

ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও দাবি করেছে যে, এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি। সংস্থাটি আরও জানায়, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে একটি প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা) আঘাত হানলেও কোনো প্রযুক্তিগত বা আর্থিক ক্ষতি হয়নি। মধ্য ইরানের খোন্দাব হেভি ওয়াটার কমপ্লেক্সেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

ইস্পাত কারখানা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত

পরমাণু স্থাপনার পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত দুটি প্রধান ইস্পাত উৎপাদন কারখানায় বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এবং মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে আহভাজের কাছের খুজেস্তান স্টিল কোম্পানি এবং ইসফাহানের মোবারাকেহ স্টিল কারখানায় এই হামলা চালানো হয়। উল্লেখ্য, এই দুটি কারখানার আংশিক মালিকানা রয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হাতে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সরাসরি এই ইস্পাত কারখানাগুলোতে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ ইরানে হামলার তীব্রতা ও পরিধি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনার বাইরে গিয়ে শুক্রবারের এই হামলাগুলো প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল তাদের রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং এখন তারা ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ব্যাপক প্রাণহানি ও তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি

শুক্রবারের এই বৃহৎ আকারের অভিযান কেবল নির্দিষ্ট স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তেহরান ও এর আশপাশের এলাকা, পাশাপাশি কাশান, আহভাজ এবং কোম শহরেও ব্যাপক হামলা চালানো হয়। জানা গেছে, কোম শহরে হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

এমন এক সময়ে এই উসকানিমূলক ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান এই আগ্রাসন বন্ধে জোরালো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই হামলার পর আপসের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক কড়া পোস্টে বলেছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বেসামরিক অবকাঠামোতে ইসরায়েলের এই বর্বরোচিত হামলার জন্য তাদের ‘ভারী মূল্য দিতে হবে’। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ইসরায়েল আমাদের দুটি বৃহত্তম স্টিল কারখানা, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। ইরান এর কঠোর জবাব দেবে এবং এর পরিণতি ইসরায়েলকে ভোগ করতে হবে।”

পারস্পরিক হামলার ধারাবাহিকতা

গত এক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে এবং গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘর্ষেও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছিল। কয়েক দিন আগেই ইরানের নাতাঞ্জে অবস্থিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েল। এর দাঁতভাঙা জবাব হিসেবে ইসরায়েলের ডিমোনায় অবস্থিত অত্যন্ত গোপনীয় পরমাণু কেন্দ্র লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এরপরই ইরানের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে পুনরায় হামলা চালায় ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, ইরান যদি তাদের পরমাণু কর্মসূচি অবিলম্বে ত্যাগ না করে, তবে তাদের সব কটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত বড় ধরনের সরাসরি হামলা স্থগিত রেখেছে, তবে শুক্রবারের এই যৌথ অভিযান প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ এখনই নিম্নমুখী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category