তীব্র তারল্যসংকটে পড়া বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ সোমবার (১৫ জুন) ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আমানতকারীদের নগদ টাকা উত্তোলনের তীব্র চাপ সামাল দিতে ব্যাংকটির চাওয়া ১০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে প্রাথমিকভাবে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গতকাল রবিবারও ব্যাংকটিকে সমপরিমাণ (আড়াই হাজার কোটি টাকা) তারল্য সহায়তা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে, তারল্য সহায়তার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করে বোর্ডের যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন নথির তথ্য মতে, চলতি জুন মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন আতঙ্কিত গ্রাহকেরা। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, ১ থেকে ৭ জুনের মধ্যে আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা এবং পরবর্তী দুই দিনে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা নগদ তুলে নেওয়া হয়।
হঠাৎ করে বিপুল অংকের এই নগদ টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়ায় গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের বেশ কয়েকটি প্রধান শাখা এবং এটিএম বুথগুলোতে তীব্র নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয়। অনেক গ্রাহক বুথে গিয়ে টাকা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে জানান, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও বড় অংকের নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
আমানতকারীদের এই নজিরবিহীন চাপ ও বুথগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার পর আজ বিকেলে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), দুইজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক তারল্য পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর রাতে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এক আদেশের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নিয়োগ সরাসরি বাতিল করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানির স্বার্থে, লাখ লাখ আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা ও জনস্বার্থে এই পর্ষদ বাতিল করা হয়েছে।
পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের পাশাপাশি ব্যাংকের দৈনন্দিন ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক বা বোর্ডের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী, নতুন পর্ষদ পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত জহির হোসেন একাই পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা ও আইনি দায়িত্ব পালন করবেন। আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দ্বিমুখী পদক্ষেপ (নগদ টাকা ধার ও পর্ষদ বদল) সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে আস্থা ফেরাতে এবং ইসলামী ব্যাংকের তারল্যসংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।