কয়েক বছর আগের কথা।
আমি আর আমার মেয়ে বের হয়েছি আইসক্রিম খেতে।
এমন সময় ফোন এলো।
আমার কথা মেয়ে শুনতে পাচ্ছে, অপর প্রান্তেরটা শুনছে না।
এ প্রান্ত থেকে আমি বলছি, ‘ভাই, আপনার চিকিৎসা দরকার। আপনি বেঁচে থাকলে আপনার হাসপাতালও বেঁচে থাকবে।’
ওপার থেকে উত্তর এলো, ‘না, ভাই, আমার সব রোজগার চিকিৎসায় দিয়ে দিলে তো রোগীদের সমস্যা হবে।’
আমি বললাম, ‘কী বললেন? না, এটা ঠিক বলেন নাই। আপনার বেঁচে থাকা জরুরি। আপনি অবহেলা করছেন জানলে আনিস ভাইও রাগ করবেন।’
‘আনিস ভাইকে বলিনি, ভাই।’
অবাক হয়ে বললাম, ‘ওনাকে জানাননি? জানানো দরকার ছিল। ওনারা আপনার সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। আমরা তো মাত্র সেদিন এলাম। তাও এখনও কিছুই করতে পারিনি। না, ভাই, আপনার কথা আমি শুনব না। আগে নিজের চিকিৎসা করান। এর জন্য আপনার অন্য কাজ আটকে থাকবে না। আপনার সুস্থ থাকা জরুরি।’
ফোন রাখার পর আমার মেয়ে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, উনি কে?’
আমি বললাম, ‘মা, আমরা জীবন ‘যাপন’ করি আর উনি এমন একজন মানুষ, যিনি জীবন ‘উদযাপন’ করেন।’
‘বুঝলাম না, বাবা।’
‘ওনার নাম জয়নাল আবেদিন। রিকশা চালান এবং রিকশা চালিয়ে ময়মনসিংহে অসহায়দের জন্য একটি হাসপাতাল তৈরি করেছেন! ভাবা যায়! যার পেটের ভাত জুটে না, তিনি উদয়াস্ত রিকশা চালিয়ে ফ্রি হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছেন! নাম দিয়েছেন নিজের মেয়ের নামে। মমতাজ হাসপাতাল। শুধু হাসপাতাল নয়, পাশেই তিনি গড়ে তুলেছেন স্কুল ও মসজিদ।’
‘আশ্চর্য তো বাবা!’
‘হ্যাঁ, মা, খুবই আশ্চর্য ব্যাপার। এখন তিনি অসুস্থ, কিন্তু চিকিৎসা করাবেন না। তাতে নাকি হাসপাতালের টাকার টান পড়বে। আমি বারবার বলার পরও রাজি হচ্ছেন না।’
‘উনি রিকশা চালান, আর ওই টাকা বাঁচিয়ে হাসপাতাল বানিয়েছেন! অবিশ্বাস্য ব্যাপার!’ মেয়ের বিস্ময় বাড়ছে।
‘হ্যাঁ, মা। অবিশ্বাস্য হলেও এটি সত্য। পত্রিকায় ওনাকে নিয়ে অনেকবার লেখা হয়েছে। বিবিসি ও আল জাজিরা টিভিও তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সিএনএন ও স্টার নিউজ তাঁকে তারকা আখ্যা দিয়েছে।’
‘আশ্চর্য! উনি পাগল নাকি বাবা?’
‘না, মা। মোটেও পাগল নন। বললাম না, আমরা জীবন ‘যাপন’ করি, আর উনি ‘উদযাপন’ করেন। হি সেলিব্রেটস লাইফ।’
‘মানে?’
‘এই যে দ্যাখ, আমরা খাচ্ছি-দাচ্ছি, বেড়াতে যাচ্ছি, অফিস করছি, তারপর ঘুমাচ্ছি। এটা কিন্তু খুবই সাধারণ জীবনযাপন। কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবা। আর উনি রিকশা চালিয়ে টাকা রোজগার করে তা অসহায় মানুষদের কাজে লাগাচ্ছেন। এমনকি হাসপাতালের সমস্যা হবে বলে নিজের চিকিৎসাও করাচ্ছেন না! এতে তিনি যে তৃপ্তি পাচ্ছেন, আমরা কি তা পাচ্ছি? মনে হয় না।’
অচেনা ‘আশ্চর্য’ মানুষটির জন্য আমার মেয়ের ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে, একটু পর বাঁধ ভেঙে তা জলের ফোয়ারা ছোটাবে।
মাঝে মাঝে চোখের জলের ফোয়ারা ছোটা ভালো। এর দরকার আছে। এভাবে কাঁদতে শিখলেই আমার রাজকন্যা জীবন ‘উদযাপন’ করবে। কেবল কেঁচোর মতো নিজের জন্য তা ‘যাপন’ করবে না।
কয়েক বছর আগে জয়নাল ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর জন্য দোয়া করবেন।
⸻
১. আমার মোর্যাল প্যারেন্টিং নিয়ে লেখা বই ‘রোজাবেল মা তোকে বলছি’ থেকে নেওয়া।
২. আনিস ভাই বলতে লেখক আনিসুল হককে বোঝানো হয়েছে। প্রথম আলো জয়নাল ভাইকে সাহায্য করেছিল।
৩. লেখাটি শেয়ার করা যাবে।
#আসুন মায়া ছড়াই